এলোভেরার অসাধারণ গুণ

এলোভেরার অসাধারণ গুণ

অ্যালোভেরা বা বাংলায় যাকে আমরা ঘৃতকুমারী নামে চিনি, সেটির ব্যবহার শুধু আমাদের দেশেই পরিচিত নয়। বরং বিশ্বের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে  ঘৃতকুমারী ব্যবহার হয়না। প্রাচীন মিশরের ক্লিওপেট্রার নাম আমরা সবাই শুনেছি। ক্লিওপেট্রার রূপচর্চার ইতিহাস কম বেশি আমাদের সবার ই জানা। রাণী ক্লিওপেট্রার রূপচর্চার প্রধান ও অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল এই জাদুকরী হার্ব বা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ । এছাড়াও প্রাচীন ভারতে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ঘৃতকুমারী ছিল অন্যতম উপাদান। এখনো ভারতীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকগণ তাদের চিকিৎসার প্রধান একটি অনুষঙ্গ হিসেবে ঘৃতকুমারী ব্যবহার করে থাকেন । আমাদের দেশে ও দিন দিন এর ব্যবহারযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ।  কম বেশি স্বাস্থ্য সচেতন প্রায় সকলেই এখন ঘৃতকুমারীর ঔষধি গুণের কদর করছেন । এর সহজলভ্যতা ও সহজপ্রাপ্যতা এর জনপ্রিয়তার অন্যতম একটি কারণ । এলোভেরার অসাধারণ গুণ ক্রমেই এটিকে বিশেষজ্ঞ থেকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলছে ।

কোথায় পাবেন ঘৃতকুমারী

আমাদের দেশের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ঘৃতকুমারী পাওয়া যায়না। পথের পাশের দোকান থেকে শুরু করে, স্থানীয় যে কোন বাজারে এই উদ্ভিদ পাওয়া যায় । তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এই জাদুকরী উদ্ভিদ আপনি চাইলে আপনার বারান্দায় কিংবা ছাদেও পেতে পারেন। ঘৃতকুমারী সাধারণত উষ্ণ জায়গায় জন্মায়, কিন্তু মোটামোটি ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় ও এই উদ্ভিদ সুন্দর ভাবে বেড়ে উঠে । তাছাড়া এই উদ্ভিদের জন্য তেমন বাড়তি কোন পরিচর্যা ও প্রয়োজন হয়না । তাই আপনি চাইলেই আপনার বারান্দায় কিংবা ছাদে ছোট কোন টবে এই উদ্ভিদ লাগাতে পারেন ।

কেন বাজার থেকে কেনা অ্যালো জেল ব্যবহার করবেন না

আজকাল পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই প্রসাধন সামগ্রীর প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে এলোভেরা জেল ব্যবহার করা হয়। এমন কি বাজারে আলাদা করে এলোভেরা জেল কিনতে ও পাওয়া যায় । কিন্তু আপনি যদি সত্যি ই স্বাস্থ্য সচেতন হন তাহলে চেষ্টা করবেন প্রাকৃতিক এলোভেরা জেল ব্যবহার করতে । কেননা বাজারের এলোভেরা জেল এ বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক পদার্থ যেমন এলকোহল ব্যবহার করা হয়। তাই এসব ব্যবহার না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এমন কি এলোভেরা জুস ও কিনে খাওয়া উচিত নয় । ঘৃতকুমারীর উপরের সবুজ আবরণ সরালে যে স্বচ্ছ ও থকথকে পদার্থ পাওয়া যায় সেটি ই এলোজেল। আর এটি কে তরল করলে এলো জুস হয়। তাই আপনি খুব সহজেই এলোজেল ও এলো জুস বাসায় ই পেতে পারেন।

এবার আসুন জেনে নেই এলোভেরার কিছু আসাধারণ গুণের কথাঃ

এলোজেল ত্বকের দাগ দূর করেঃ

স্বচ্ছ এলোজেল ত্বকের অনেক সমস্যার সমাধান দেয়। ঠাণ্ডা ও একদম প্রাকৃতিক এলোজেল ত্বকে নিয়মিত ব্যবহার করলে এটি ত্বকের দাগ দূর করে । এছাড়া এটি ত্বকে সতেজ ভাব নিয়ে আসে।

ত্বকের লোমকূপ এর আকৃতি ছোট করেঃ

এলোভেরা তে এস্ত্রিঞ্জেন্ট নামক একটি উপাদান আছে যা ত্বক কে টানটান করে ও লোমকূপের আকার ছোট করে। তাজা এলোভেরার কিছু জেল নিন, এবং সেটি ত্বকে প্রয়োগ করুন । কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন ও শুকিয়ে যেতে দিন। যাতে করে আপনার ত্বক এলোভেরার রস শোষণ করে নিতে পারে। ভাল করে শুকিয়ে গেলে শুধু পানি দিয়ে ভাল করে ত্বক ধুয়ে ফেলুন। আপনি চাইলে এলোভেরার রসের সাথে লেবুর রস ও যোগ করতে পারেন। কিন্তু আপনার ত্বকে যদি চুলকানি বা অস্বস্তি অনু ব করেন তাহলে লেবুর রস ব্যবহার না করাই ভাল ।

ত্বকের র‍্যাশ দূর করেঃ

অনেকের ই ত্বকে দেখা যায় লাল লাল কিংবা দানা দানা এক ধরণের র‍্যাশ উঠে । যা দেখতে খুব ই বাজে লাগে । এরকম হলে র‍্যাশ আক্রান্ত স্থানে এলভেরার রস প্রয়োগ করুন। কিছুদিন নিয়মিত ব্যবহার করলে এধরনের র‍্যাশ চলে গিয়ে ত্বক পরিষ্কার হয়ে যাবে ।

এলার্জি প্রশমন করে এলোভেরাঃ

অনেকের এধরণের র‍্যাশ উঠার পাশাপাশি র‍্যাশ এ চুলকানি ও হয়, তাছাড়া শরীরের অন্যান্য স্থানে ও চুলকানি দেখা দেয় । এলোভেরা তে আছে এন্টি-ইনফ্লামাটরি জাতীয় উপাদান, যা ত্বকের প্রদাহ কমায় । চুলকানি আক্রান্ত স্থানে এলোভেরার ঠাণ্ডা রস মেখে রাখুন । নিয়মিত কিছুদিন ব্যবহার করুন। অস্বস্তিকর চুলকানি অনেকটাই সেরে যাবে ।

কাঁটা-ছেড়া বা পোড়ায় প্রশান্তি আনেঃ

যদি শেভ করার সময় সামান্য কেটে যায় কিংবা রান্না করার সময় গরম তেলের ছিটা পড়ে বা হাল্কা কেটে যায় সেক্ষেত্রে এলোভেরার ঠাণ্ডা অনুভুতি আপনাকে অনেকটাই প্রশান্তি দিবে। ছোট খাটো কাঁটা ছেড়া বা পুড়ে গেলে এলোভেরার ভিতরের শাঁস টি বের করে আক্রান্ত স্থানে প্রয়োগ করুন। এটি আক্রান্ত স্থানের প্রদাহ কমিয়ে দিবে ও ত্বকে প্রশান্তি এনে দিবে। তবে বড় কাঁটা ছেড়া বা পোড়ায় অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন।

ত্বক কে নরম কোমল ও লাবণ্যময় করে এলোভেরাঃ

এলোভেরা একটি চমৎকার প্রাকৃতিক ময়েশ্চরাইজার । এটির একটি বিশেষ গুণ হল যে এটি প্রায় সব ধরণের ত্বকের সাথেই খুব ভাল ভাবে মানিয়ে যায় । বিশেষ করে লাবণ্যহীন, খসখসে ত্বকের জন্য এটি এক কথায় মহৌষধ । স্বাভাবিক ত্বকেও এটি সমানভাবে মানানসই । তাই আপনার ত্বকের ধরণ নিয়ে বাড়তি কোন চিন্তা আপনাকে করতে হয়না । এলোজেল আপনি সরাসরি মুখে বা শরীরের অন্য অংশে প্রয়োগ করতে পারেন অথবা বাড়িতে কোনো ফেস প্যাক তৈরি করে ও ব্যবহার করতে পারেন । আপনার ত্বক যদি খুব বেশি শুস্ক ও রুক্ষ হয় তাহলে এলোজেল এর সাথে ভিটামিন ই ক্যপসুল মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন । এটি খুব দ্রুত আপনার ত্বক নরম, কোমল ও দীপ্তিময় করে তুলবে।

চুলের বৃদ্ধি ও চুলের কন্ডিশনার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ঃ

আপনার যদি চুল পড়া ও চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার সমস্যা থাকে তাহলে এলোভেরার উপর নির্ভর করতে পারেন । নিয়মিত মাথার ত্বকে এলোভেরার জেল ব্যবহার করলে চুল পড়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে । এছাড়াও চুল ধোয়ার পর কন্ডিশনার হিসেবে এলোজেল ব্যবহার করতে পারেন। এটি চুল কে নরম ও ঝলমলে করতে সাহাজ্য করে। নিয়মিত মাথার ত্বকে এলোজেল ভাল করে ঘসে লাগালে নতুন চুল গাতে সাহাজ্য করে । সপ্তাহে অন্তত একদিন এটি অভ্যাস করা ভাল ।

ত্বক ভিতর থেকে পরিস্কার করে এলোভেরাঃ

নিজেকে সুন্দর দেখতে আমরা সবাই পছন্দ করি । কিন্তু বাহ্যিক প্রসাধনী আসলে পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের প্রকাশ করতে পারেনা। সৌন্দর্য আসলে আসে ভিতর থেকে । আপনার ত্বক যদি ভিতর থেকে পরিস্কার থাকে তাহলে প্রসাধনহীন আপনি ও হয়ে উঠবেন লাবণ্যময়ী ও দীপ্তিময় । এলোভেরা দিয়ে বডি স্ক্রাব ব্যবহার করলে আপনার ত্বক ভিতর থেকে পরিস্কার হয়ে ত্বক উজ্জ্ব্বল হয়ে উঠবে। এর জন্য প্রয়োজন

  • ২ কাপ লবণ
  • ১ কাপ এলোজেল
  • ১ কাপ বেবি অয়েল
  • ১ টেবিল চামচ মধু

এবার সব উপকরণ ভাল করে মিশিয়ে নিন ও বডি স্ক্রাব হিসেবে ব্যবহার করুন। ভাল করে শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ত্বকের সাথে মানানসই কোনো ময়সচরাইজার ব্যবহার করুন। এবার নিজেকে নিজেই আবিস্কার করুন।

বার্ধক্যের ছাপ দূর করে এলোভেরাঃ

এলোভেরা আপনার ত্বকে বলিরেখা পরতে বাধা দেয় ও ত্বককে অকালে বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। এলোভেরা ত্বকে খুব দ্রুত ও সহজেই শোষণ হয় । এলোভেরা তে আছে এন্টি-এজিং উপাদান যা ত্বকের কোলাজেন এর নিঃসরণ ত্বরান্বিত করে। এতে করে ত্বকে বলিরেখা বা বয়সের ছাপ পড়া বিঘ্ন হয়। আপনি চাইলে সরাসরি বলিরেখার উপর এলোজেল প্রয়োগ করতে পারেন অথবা এলোজেল দিয়ে তৈরি ফেস প্যক ও ব্যবহার করতে পারেন।

এসব ছাড়াও পোকা মাকড়ের কামড় থেকে যে জ্বালা-পোড়া হয়, সেসব ক্ষেত্রে এলোজেলের রস খুবই উপকারী ও প্রশান্তিদায়ক । সুতরাং এতসব গুণের আধার এই সহজলভ্য উদ্ভিদ টি আজই আপনার বাসার টবে লাগান আর প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করে নিজেকে করে তুলুন আকর্ষণীয় ও অনন্য ।

 

মন্তব্যসমূহ

নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে একটা কথা বলতে চাই - সপ্ন দেখতে ভালবাসি, সপ্ন দেখাতে ভালবাসি

মন্তব্য করুন