রেফ্রিজারেটরের ব্যবহারবিধি

রেফ্রিজারেটর খুবই দরকারি আমাদের সংসারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার আমরা সাধারণত যা খাই তার প্রায় সবই রেফ্রিজারেটর ছাড়া ভালো রাখা কষ্টকর। এই রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ  যেমন  শখের একটা জিনিস, ঠিক তেমনি দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য একটি অংশও বটে। এই যন্ত্রটি জীবনযাত্রাকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। এটি ব্যবহারে খাবার, শাকসবজি, মাছ-মাংস ইত্যাদি খাবার সংরক্ষণ করা হয় বলে রেফ্রিজারেটর ময়লা হওয়া এবং এর  মধ্যে বিভিন্ন খাবার সংরক্ষণের কারণে গন্ধ হওয়াও খুব স্বাভাবিক। যেহেতু রেফ্রিজারেইটরে আমরা খাবার সংরক্ষণ করি তাই এর যথাযথ ব্যবহার ও যত্ন করা দরকার।

এক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চললে পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য ভালো থাকার পাশাপাশি বারবার ফ্রিজ পরিস্কার করার হাত থেকে রক্ষা পাবেন । কারন কিছুদিন পরপরই যদি ফ্রিজ নোংরা হয়ে যায় তাহলে সেটা পরিষ্কার করা খুবই কষ্টকর। চলুন তাহলে জেনে নেই রেফ্রিজারেটর ব্যবহারের টুকিটাকি কিছু টিপস –

০১। ভোল্টেজ যদি ওঠানামা করে রেফ্রিজারেইটর নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা উচিত।

০২। বেশি বেশি রেফ্রিজারেটরের দরজা খোলা উচিত নয়। তাছাড়া বেশি সময়ের জন্য দরজা খুলে রাখলেও ক্ষতি হতে পারে।

০৩।  ফলমূল  বা শাকসবজি সবকিছুই ভালো মতো ধুয়ে ফ্রিজে রাখুন। তাহলে ফ্রিজে গন্ধ হবে না। ডিপ ফ্রিজে ফল বা তরকারি রাখা ঠিক নয়। এতে স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।

০৪। যে কোনো সবজি প্লাস্টিকের প্যাকেটে রাখার চেষ্টা করুন। প্লাস্টিকের প্যাকেটের মুখ ভালো মতো শক্ত করে বেধে দিন। এতে শাকসবজি ভালো ও টাটকা থাকবে। কাঁচা মরিচের বোটা ফেলে প্লাস্টিকের ব্যাগে মুখ বন্ধ করে রাখুন।

০৫। পুদিনাপাতা, ধনিয়াপাতা,  লেটুস পাতা ইত্যাদি ফ্রিজে রাখার পরও শুকিয়ে যায়। এগুলোর গোড়া কেটে ফ্রিজে রাখুন। সহজে শুকাবে না।

০৬।  শসা  ওও টমেটো এক প্যাকেটে না রেখে আলাদা আলাদা প্যাকেটে রাখুন। অনেকদিন টাটকা থাকবে।

০৭। ডিম রাখার ক্ষেত্রে ডিমের মোটা দিকটা নিচের দিক করে রাখলে ডিম অনেকদিন ভালো থাকে।

০৮।  বিভিন্ন কারনে ফ্রিজে গন্ধ সৃষ্টি হতে পারে, এই গন্ধ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পুরান খবরের কাগজ ভাঁজ করে ফ্রিজের এক কোণায় রেখে দিলেও উপকার পাওয়া যাবে।

০৯। রেফ্রিজারেটরের ভেতরে খাবার রাখার ক্ষেত্রে দুটি পাত্রের মধ্যে কমপক্ষে  তিন থেকে চার সে.মি. জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে, যাতে ঠান্ড বাতাস সহজেই চলাচল করে সব খাবার সমান ঠান্ডায় রাখতে পারে।

১০। ফ্রিজে কোনো খাবার রেখে বের করার পর সেটা  একবারেই গরম খেয়ে নিন। বারবার গরম ও ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখলে ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

১১। মাছ-মাংস সংরক্ষন করার সময় চর্বি ও ময়লা ফেলে দিয়ে তারপর রাখুন ফ্রিজে। প্রতিদিনের জন্য আলাদা আলাদা করে ভাগ করে রাখলে ঝামেলা কম মনে হবে।

১২। ফ্রিজের উপর কখনোই ভারি জিনিস রাখবেন না।

১৩। ফ্রিজে খাবার আলগা করে রাখবেন না। এতে এক খাবারের গন্ধ ছড়িয়ে পরে অন্য খাবারে। রান্না করা খাবার এয়ারটাইট কনটেইনারে ঢুকিয়ে ফ্রিজে রাখুন বা ঢেকে রাখুন।

১৪। গরম খাবার কখনও ফ্রিজে রাখবেন না। রান্না করা খাবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় নেয়ার পর রাখুন ফ্রিজে।

১৫। একেবারে দেয়াল ঘেঁষে ফ্রিজ রাখা উচিত নয়। যতটা সম্ভব  খোলামেলা জায়গায় রাখুন। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন এতে সরাসরি রোদ না লাগে।

১৬। ফ্রিজ পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে আগে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী নবটি বন্ধ করে দিন। বরফ গলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ফ্রিজের ড্রয়ার ও অন্যান্য অংশ বের করে নিন। হালকা কুসুম গরম পানিতে লিকুইড সোপ মিশিয়ে খুলে রাখা তাক, ড্রয়ার ইত্যাদি  ভেতরের অংশগুলো ভালোভাবে  পরিষ্কার করুন। ফ্রিজের বাইরের অংশ পরিষ্কার করার জন্য ভিনেগার বা ক্লিনার ব্যবহার করতে পারেন। শেষে ঠাণ্ডা পানিতে সবকিছু ধুয়ে খুব ভালো করে মুছে নিন। চালু করার ১৫-২০ মিনিট পর ফ্রিজে খাবার রাখবেন।

১৭। বছরে একবার ইলেকট্রিক সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে ফ্রিজের পিছনে বা নিচে থাকা কয়েল পরিষ্কার করুন। নরম ব্রাশ বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করতে পারেন কয়েল।

১৮। রেফ্রিজারেইটরের দরজা খোলা ও বন্ধ করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত ।

১৯। রেফ্রিজারেটরের দরজায় কোন  লিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য তিন টুকরা কাগজ দরজার ৩ কোণে দিয়ে তা বন্ধ করতে হবে। যদি কোন কোণা থেকে কাগজগুলো পড়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে ওই পাশে লিক আছে। আর তাহলে যত দ্রুত  সম্ভব তা ঠিক করাতে হবে।

২০। রেফ্রিজারেটরে এমনভাবে খাবার রাখা উচিত যেন বাটির কারণে ফ্রিজের লাইট আড়ালে না পরে।

২১। সবসময় তাক অনুযায়ী খাবার সাজিয়ে রাখা উচিত।

২২। কোন রকম খসখসে জিনিস যেমন- স্ক্রাবার, ধাতব বস্তু
ও শক্ত ব্রাশ দিয়ে রেফ্রিজারেটর  পরিষ্কার করা বা ঘষাঘষি করা ঠিক নয়।

২৩। ঢিলা সিল থাকলে তা ঠাণ্ডা বাতাস বাইরে বের করে আনে, এটা বিদ্যুৎ অপচয় করে এবং আপনার ফ্রিজের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। প্রথমে নিশ্চিত হয়ে নিন যে সিলগুলোতে খবারের কোন কণা আটকে নেই। (এগুলোকে প্রতি বছরে কমপক্ষে দুই -তিন বার করে পরিষ্কার করুন, এর জন্য একটি টুথব্রাশ এবং বেকিং সোডা ও পানির মিশ্রণ ব্যবহার করুন)

২৪। একটি টাকার নোট দরজায় দিয়ে এমনভাবে খুলুন যেন অর্ধেক অংশ ভিতরে এবং অর্ধেক অংশ বাইরে থাকে। যদি এটি সহজেই পিছলিয়ে চলে আসে, তাহলে অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে দরজার সিল পরীক্ষা করাতে হবে।

২৫। যখন কনডেনসারের কয়েল ময়লা দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে থাকে, তখন রেফ্রিজারেটর ভালভাবে কাজ করতে পারে না। বছরে দুই থেকে তিন বার এটিকে খুলে পিছন থেকে কয়েলটিকে আলাদা করুন ( অথবা কয়েলটি যদি সামনের দিকে থাকে, তাহলে গ্রিলটিকে খুলুন।), এইবার রেফ্রিজারেটরটিকে আনপ্লাগ করে দিন , এবং ব্রাশ ব্যবহার করে বাতাস বের করে ফেলুন।

২৬। ফ্রিজটিকে ৩৭ ডিগ্রী থেকে ৪০ ডিগ্রী ফারেনহাইটের মধ্যে এবং ফ্রিজারটিকে ০ ডিগ্রীর মধ্যে রাখা উচিত ।

২৭। নিচু তাপমাত্রা বজায় রাখতে রেফ্রিজারেটরকে সব সময় “থার্মাল ভর” (অনেক উপাদান) এ রাখা উচিত। ঠান্ডা খাবার এবং পানীয় গরম বাতাস শোষণ করে নেয় যা আপনার দরজা খুলার সাথে সাথেই বের হয়ে চলে যায়। আপনি যদি খুব পেটুক হন অথবা আপনার ফ্রিজ যদি আপনার প্রয়োজনের থেকে বেশি বড় হয়, তাহলে তার ভিতরে কিছু পানিভর্তি জগ রাখুন।

২৮। বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে দরজাগুলো বন্ধ করে দিন এবং ঘরের মধ্যে জমিয়ে রাখা খাবারগুলো ব্যবহার করুন। একটি বন্ধ রেফ্রিজারেটর খাবারকে চার ঘন্টা পর্যন্ত ভাল রাখতে পারে। ফ্রিজার এর তাপমাত্রা ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে যদি এটি ভর্তি থাকে, আর যদি অর্ধেক ভর্তি থাকে তাহলে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত বজায় রাখতে পারে।

উপরে উল্লেখিত টিপসগুলো মেনে চলতে পারলে আপনার ফ্রিজ থাকবে পরিষ্কার ও সুরক্ষিত। তাহলে আজ থেকেই ফ্রিজ এর প্রতি যত্নবান হোন আর আপনার ফ্রিজ থাকুক সজত্নে।

মন্তব্যসমূহ

আমি একজন শিক্ষার্থী। নতুন কিছু সম্পর্কে জানতে ও শিখতে ভালোবাসি এবং অন্যদের সাথে সেটা শেয়ার করতে ভালো লাগে।

মন্তব্য করুন