ছারপোকার ক্ষতিকর দিকসমূহ এবং প্রতিকারের উপায়

যাদের বাসায় ছারপোকার উপদ্রব আছে শুধু তারাই জানেন এর যন্ত্রনা কত ভয়াবহ। এটি  সিমিসিড গোত্রের এক ধরনের ক্ষুদ্র পরজীবী পতঙ্গ বিশেষ। ছারপোকা  মানুষ এবং অন্য উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট কিছু প্রাণীর রক্ত চুষে খেয়ে জীবন ধারন করে ও বেঁচে থাকে। এই পোকাটি বিছানায় বেশি দেখা যায় কিন্তু ছারপোকার সবচেয়ে পছন্দ হলো তোষক বা ম্যাট্রেস, সোফা ও অন্যান্য আসবাবপত্রের কোণায় থাকতে পছন্দ করে এরা।

সাধারণত অপরিষ্কার ও স্যাঁতসেঁতে  বিছানা এবং আসবাবপত্রের জন্যই ছারপোকার উপদ্রব ঘটতে দেখা যায়। এছাড়া স্যাঁতসেঁতে কোন জায়গায় এই পোকা বেশি বংশ বিস্তার করে থাকে । ছারপোকা কোন নিশাচর প্রাণী  না তবুও  এটি প্রধানত  রাতের বেলাতেই বেশি সক্রিয় থাকে এবং মানুষের অজান্তে রক্ত চুষে খেয়ে নেয়। অনেকদিন যাবত যদি কেউ ছারপোকার কামড় খেয়ে থাকেন, তার ফলে একাধিক কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

 

কিছুদিন আগে একটি ইন্টারন্যাশনাল জার্নালের গবেষণা পেপারে প্রকাশিত হয়েছে যে , বহুদিন যাবত যদি কোন মানুষ  ছারপোকার কামড় খেতে থাকেন, তাহলে অনেক ধরনের জটিল রোগ শরীরে বাসা বাধার অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। তার সাথে দেহের কর্মক্ষমতা এবং আয়ুও কমে যায়। যার কারন হলো রাতের আধারে এই পোকাটি আমাদের দেহে আক্রমণ করা এই ছারপোকা রক্ত খাওয়ার সময় কিছু কিছু ক্ষতিকর উপাদান আমাদের শরীরে ঢুকিয়ে দেয় যাতে অনেক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।

অ্যালার্জি

কিছু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ছারপোকা কামড়ালে কোন কোন ব্যক্তির খুবই মারাত্মক টাইপের অ্যালার্জি জনিত সমস্যা হয়। সেই ক্ষেত্রে রক্ত চাপ কমে  যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস নিতেও কষ্ট হতে পারে এবং দিনের পর দিন তা  বাড়তে শুরু করে। এই ধরনের পরিস্থিতি তে পরলে যদি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা করা না হয়, তাহলে এই কষ্টটা আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। আর তাই যাদের অ্যালার্জি জাতীয়  সমস্যা আছে তাদের অতিরিক্ত সাবধান থাকা উচিত।

বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ

দেখতে খয়েরি রঙের এই ছোট ছোট  পোকা গুলোর কামড়ের কারণে মারাত্মক টাইপের বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ হতে পারে।  ছারপোকারা কামড়ানোর পরে ক্ষত স্থান গুলোতে ক্ষতিকর ভাবে  চুলকাতে শুরু করে। চুলকাতে চুলকাতে যদি কেটে যায় , তাহলে সে জায়গা দিয়ে অনেক ক্ষতিকর জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। আর এর কারনে আমাদের শরীরের বিভিন্ন রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

শ্বাসকষ্ট বা হাপানী

যেই সব ঘরে ছারপোকারা বাসা তৈরি করে, সেই সব ঘরের সদস্যদের শ্বাসকষ্ট বা হাপানী তে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।  আর তাই ডাক্তার দের কথা মতে, যারা অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট রোগে ভুগছেন, তাদের পরিবারে বা আশেপাশে যদি এমন ছার পোকাদের সংখ্যা বেড়ে যায়  তাহলে এই রোগের প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পায়।

 

একাকিত্ব বোধ করা

প্রায় সবার মনেই ছারপোকাদের নিয়ে একটা ভয় কাজ করে। সবাই ই এমন কোন বাসায় যেতে পছন্দ করেন না যেখানে ছারপোকারা তাদের রাজত্ব তৈরি করেছে। এর ফলে এসব বাসার বাসিন্দারা অনেক সময় একাকিত্বে ভোগেন, যা কি না  আস্তে আস্তে তাদের দেহ এবং মনের ভেতর খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

ইনসোমনিয়া

বাসায় যদি ছাড়পোকা থাকে আর সারা রাত ছারপোকার কামড় খেতে হয় তাহলে ঘুম  কীভাবে আসবে? আর তাই এই ছারপোকাদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখাটা একান্ত প্রয়োজন। তা না হলে প্রথম প্রথম ঘুম ছুটবে। আর তারপর দিনের পর দিন কামড় খেয়ে  নানা রকম রোগ রোগ শরীরের ভেতর বাসা বাঁধবে। এর আরেকটা কারণ হলো  ঘুম পর্যাপ্ত না হলে শরীরের পেশী ভাঙতে শুরু করে। সেই সাথে  দেহের প্রায় প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা দিন দিন কমতে শুরু করে।

 

অ্যানিমিয়া

অনেক দিন ধরে যারা দিনের পর দিন ছারপোকার কামড় খেয়ে চলেছেন তাদের দেহে লোহিত  রক্ত কণিকার পরিমাণ দিন দিন কমতে শুরু করে। যার ফলে রক্ত শুন্যতা অথবা অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন বেড়ে যায়।  আর ছারপোকার প্রধান খাবারই হল রক্ত। এবার ভেবে দেখুনতো  এক সঙ্গে অনেক অনেক ছারপোকা পোকা আপনার দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে দিনের পর দিন লিটারের পর লিটার রক্ত খেয়ে যাচ্ছে। এমন যদি হয় তাহলে কি আর শরীরে রক্ত থাকবে?

 

মানসিক প্রেসার ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়

ছারপোকা রা  নিয়মিত  আক্রমণ করার কারণে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিন দিন কমে যেতে শুরু করে। তার সঙ্গে আমাদের শরীরে অনেক রকম পরিবর্তন হওয়ার জন্য মানসিক প্রেসার এবং উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। আর তাই ছারপোকা  ছোট হলে এটি খুব ক্ষতিকর তাই আমাদের উচিত  এই পোকাটি থেকে সাবধানে থাকা।

 

প্রতিকারের কিছু উপায়

ছারপোকার কামড়ের জন্য ঘরোয়া কিছু প্রতিষেধক ঘরে বানিয়ে ব্যবহার করা যায়। যদি বাসায় একবার ছারপোকা বাসা বাধে তাহলে সেগুলো দূর করা খুব কঠিন হয়ে যায়। আর তাই দেহের ও মানসিক সুস্থতার জন্য এটি তাড়বার কিছু ঘরোয়া উপায় জানা খুব জরুরি।

জীবাণুনাশক সাবান

ছারপোকার কামড়ের জন্য যাদের চুলকানি হয়েছে সেটা থেকে রক্ষা পাওয়ার একটা উপায় রয়েছে আপনার হাতের কাছেই ।  ছারপোকা যদি কামড়ায় তাহলে সবার প্রথমেই ‘জীবাণুনাশক সাবান’ এবং পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিন। তারপর যদি নিচে উল্লেখ করা প্রাকৃতিক উপাদান গুলো আপনি ব্যবহার করেন তাহলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো যায়।

 

কলার খোসা

কলার খোসাতে আছে ‘ক্যারোটেনয়েডস’ এবং ‘পলিফেনলস’ নামক জৈব উপাদান। এসব জৈব উপাদান শরীরের জীবানু নাশ করতে সাহায্য করে থাকে। কলার খোসার ভেতরের অংশ টা যদি  ছারপোকা কামড়ানোর স্থানে ঘষে দিন তবে জ্বালাপোড়া অথবা চুলকানির কষ্ট অনেকটা প্রশমিত হয়। এই পদ্ধতিটি আপনি যতবার খুশি ততবার ইই অনুসরণ করতে পারবেন।

দারুচিনি এবং মধু

দারচিনি এবং মধু তে অনেক প্রদাহ বিরোধী উপাদান আছে তাই  দারুচিনির গুড়া এবং মধু একসাথে  মিশিয়ে ছারপোকার কামড়ের যে ক্ষতস্থান সেটা নিরাময়ে কাজে লাগাতে পারবেন। এ দুইটির ব্যবহারেও অনেকটা সংক্রমণের সম্ভাবনা কমে যায়। দুই বা তিন চা চামচ দারুচিনির গুঁড়ার নিয়ে এর সাথে  সমপরিমাণ মধু ভালো ভাবে মিশিয়ে আক্রান্ত যায়গায় লাগিয়ে রাখুন। কিছুক্ষণ রেখে শুকিয়ে যাওয়ার পর ভালো ভাবে  ধুয়ে ফেলুন। প্রতিদিন দুই থেকে চারবার পেস্টটি ক্ষতস্থান এ প্রয়োগ করলে ভালো উপকার পাবেন।

লবণ

ছারপোকার কামড়ালে যে  র‌্যাশ ও প্রদাহ তৈরি হয় তা ভালো করতে সাহায্য করে লবন। এতে আছে প্রাকৃতিক ব্যাক্টেরিয়া নাশক উপাদান। এটা কামড়ানোর স্থানে অল্প ঘষলে চুলকানি এবং জ্বালাপোড়া থেকে খুব দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যায়। এটা ভালো ফল পাওয়ার জন্য দিনে দুই বা তিনবার লাগাতে পারেন।

 

ছারপোকা খুব ক্ষতিকর একটি পতঙ্গ। এটি রাতের ঘুম দূর করার সাথে সাথে জীবন টাও দুর্বিষহ করে তোলে। এই বিরক্তিকর পোকাটি থেকে মুক্তি পেতে আপনার বাসা সবসময় পরিষ্কার রাখুন এবং আসবাবপত্র, তোশক, বাদিন।লিশ ইত্যাদি মাঝে মাঝে রোদে দিন এবং উপরে উল্লেখিত প্রতিকার এর উপায় গুলো মেনে চলুন এতে ছারপোকা আপনার এবং আপনার বাসা থেকে একশ হাত দূরে থাকবে।

মন্তব্যসমূহ

আমি একজন শিক্ষার্থী। নতুন কিছু সম্পর্কে জানতে ও শিখতে ভালোবাসি এবং অন্যদের সাথে সেটা শেয়ার করতে ভালো লাগে।

মন্তব্য করুন