চটপট বানান সহজ ও মজার ব্রেড হালুয়া

চটপট বানান সহজ ও মজার ব্রেড হালুয়া

আমি একজন ফাকিবাজ রাধুণী। এজন্য যে কোন রান্না করার সময় আমার প্রথম ও প্রধাণ চেষ্টা থাকে কিভাবে সহজে আর অল্প সময়ে একটা রান্না শেষ করে ফেলা যায়। এজন্য যে কোন রান্না করার ক্ষেত্রে আমি এমন সব উপকরণ ও ফ্লেভার যোগ করার চেষ্টা করি যেগুলো অনেক সহজে পাওয়া যায়। এবং যেগুলো খুব কম সময়ে রান্না করা সম্ভব। এই রকম একটা উপকরণ হচ্ছে ব্রেড। বাড়ির পাশে যে কোন মুদি দোকানে সব সময়ই ব্রেড কিনতে পাওয়া যায়। আর ব্রেড রান্না হতে একদমই সময় লাগে না। তাই ব্রেড দিয়ে যদি হালুয়া বানানো যায় তাহলে কিন্তু মন্দ হয় না। এই ব্রেড হালুয়া বানাতে সময় লাগে অত্যন্ত কম। আর খুব সহজে অল্প উপকরণ দিয়েই কিন্তু এটি ঘরে বসে বানিয়ে ফেলা যায়।

আমাদের বাসায় প্রায়ই দেখা যায় কিছুটা ব্রেড বেচে যায়। এই বাসি ব্রেড গুলো সাধারণত কেউই খেতে চায় না। ফলাফল এই ব্রেড গুলো ফেলে দিতে হয়। অথচ কোন রকম খাবারই কিন্তু অপচয় করা ঠিক না। তা সে যত কম দাম এর খাবারই হোক না কেন। এই বেচে যাওয়া ব্রেড গুলো খাওয়ার খুব দারুণ একটা উপায় হতে পারে এই ব্রেড হালুয়া। আবার অনেক বাচ্চা আছে যারা দুধ খেতে পছন্দ করে না। কিন্তু আমরা সকলেই জানি বাচ্চাদের জন্য দুধ কতটা উপকারি একটা খাবার। এজন্য বাচ্চাদের দুধ খাওয়ানোর একটা ভাল উপায় হতে পারে এই ব্রেড হালুয়া। কারণ বাচ্চারা দুধ খেতে পছন্দ না করলেও যে কোন মিষ্টি খাবার খেতে কিন্তু ঠিকই পছন্দ করে থাকে। আর বাচ্চাদের জন্য সন্ধ্যার নাস্তা কিংবা স্কুলের টিফিন হিসেবে খুব সহজে আর খুব কম সময়ে এই ব্রেড হালুয়া বানিয়ে ফেলা সম্ভব।

ব্রেড হালুয়া বানাতে যা যা লাগবে

ব্রেড হালুয়া বানাতে কিন্তু খুব বেশি ধরণ এর উপকরণ এর দরকার হয় না। সাধারণ হালুয়া বানাবার উপকরণ ব্যবহার করেই এই ব্রেড হালুয়া বানিয়ে ফেলা যায়। আমি এখানে বাচ্চাদে পুষ্টির কথা মাথায় রেখে বেশ কয়েক ধরণ এর বাদাম ব্যবহার করেছি। আপনি আপনার পছন্দ মত এক বা একাধিক ধরণ এর বাদাম ব্যবহার করতে পাড়েন। অথবা আপনার বাচ্চার যদি বাদাম কোন ধরণ এর সমস্যা কিংবা এলার্জি থাকে তাহলে বাদাম না ব্যবহার করলেও চলবে। এই ব্রেড হালুয়া বাদাম ছাড়াও এমনিতেই অনেক টেস্টি লাগে খেতে। আর এই রেসিপিতে দুধ ও বিভিন্ন রকম বাদাম এর সাথে সাথে বেশ খানিকটা ঘিও ব্যবহার করা হয়েছে। বলাই বাহুল্য বাচ্চাদের শারিরিক গঠন ও হাড়ের গঠন মজবুতকরতে ঘি খুব কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। আসুন দেরি না করে ব্রেড হালুয়া বানাতে কি কি উপকরণ কি কি অনুপাতে লাগবে তা জেনে নেই।

  • ব্রেড টুকরা ১ কাপ
  • ঘি ১/৪ কাপ
  • চিনি ১/৪ কাপ
  • দুধ ১/২ কাপ
  • গোলাপ জল ১ চা চামচ
  • কেওড়া জল ১ চা চামচ
  • কেশর ৪ থেকে ৫ দানা
  • কিশমিশ ৫ থেকে ৬টি
  • কাজু বাদাম ৫ থেকে ৬টি
  • কাঠ বাদাম ৫ থেকে ৬টি
  • পেস্তা বাদাম ৫ থেকে ৬টি
  • চিনা বাদাম ৫ থেকে ৬টি
  • মাওয়া ১/৪ কাপ
  • এলাচ ১টি

ব্রেড হালুয়া যে পদ্ধতিতে বানাতে হবে

যদিও ব্রেড হালুয়া খুব সহজ আর কম সময়ে বানানো যায় এমন একটি রেসিপি। তবুও এই ব্রেড হালুয়া বেশ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে বানাতে হয়। এই যেমন আলাদা ভাবে দুধ ফুটিয়ে রেডি করা, কিংবা বাদাম ভেজে রেডি করা অথবা ব্রেড ভেজে রেডি করে নেয়া ইত্যাদি। তবে যেহেতু উপকরণ অনেক কম তাই আপনি যদি সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে রান্নাটা শুরু করেন তবে খুব সহজেই পুরো রান্নাটা শেষ করে ফেলা সম্ভব। আসুন মজাদার ব্রেড হালুয়া বানাবার ধাপ গুলো জেনে নেই।

১ম ধাপ

প্রথমেই দুধটা ফ্লেভারিং করে গরম করে নিতে হবে। এর জন্য একটা সস প্যানে দুধ ফুটতে দিতে হবে। দুধ ফুটে উঠলে এর মধ্যে একটা এলাচ দিয়ে দিতে হবে। এলাচ দেবার পর আরো দুই মিনিট থেকে তিন মিনিট দুধটা ফুটতে দিতে হবে। এতে করে এলাচ এর ফ্লেভার দুধ এর সাথে ভাল ভাবে মিশে যাবে। এবং ব্রেড হালুয়া এর মধ্যে খুব সুন্দর একটা ফ্লেভার যোগ করবে। দুধ একটু ঘন হয়ে আসলে চুলা বন্ধ করে ঢেকে দিতে হবে যাতে করে দুধ ঠান্ডা হয়ে না যায়। কারণ ব্রেড হালুয়ার মধ্যে সব সময় গরম দুধ ব্যবহার করা উচিত।

২য় ধাপ

এই বার একটা ছোট পাত্রে গোলাপ জল ও কেওড়া জল নিতে হবে। এই গোলাপ জল ও কেওড়া জল এর মধ্যে কেশর দানা গুলো ভিজিয়ে দিতে হবে। কেশর ব্যবহার করার আগে এটাকে সব সময় কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখা উচিত। অন্ত দশ মিনিট থেকে পনেরো মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে করে কেশর থেকে এর আসল ফ্লেভার ও রঙ খুব ভাল মত বের হয়ে আসে। আর গোলাপ জল ও কেওড়া জল এর এমনিতেই নিজস্ব সুন্দর একটা গন্ধ আছে। যেহেতু কেশর গোলাপ জল ও কেওড়া জল এর মিশ্রণের ডুবিয়ে রাখা হয়েছে তাই এর ফ্লেভার এই দুই লিকুইডের সাথে মিশে খুব সুন্দর একটা খুশবু তৈরী করে যা ব্রেড হালুয়াতে এক অন্য মাত্রা এনে দিতে পারে।

৩য় ধাপ

একটা ছোট পাত্রে পানিতে কিছমিশ গুলো ডুবিয়ে রাখতে হবে। কম পক্ষে বিশ মিনিট থেকে পচিশ মিনিট এর জন্য কিশমিশ গুলো পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এই সময়ের মধ্যে কিশমিশ গুলো আনি শোষণ করে ফুলে ফেপে উঠবে। তখন একটা ছোট ঝাঝরিতে রেখে এগুলো থেকে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে।

৪র্থ ধাপ

একটা ফ্রাইং প্যানে ২ টেবিল চামচ ঘি নিতে হবে। ঘি গরম হয়ে গেলে এর মধ্যে একে একে কাজু বাদাম, চিনা বাদাম, কাঠ বাদাম ও পেস্তা বাদাম দিয়ে দিতে হবে। সেই সাথে পানি ঝরিয়ে রাখা কিশমিশ গুলোও দিয়ে দিতে হবে। খুব কম আঁচে নেড়ে চেড়ে বাদাম ও কিশমিশের মিশ্রণ গুলো ভেজে নিতে হবে। খুব বেশি সময় ভাজার দরকার নেই। মোটামুটি দুই মিনিট থেকে তিন মিনিট সময় ধরে ভাজলেই হবে।

এরপর বাদাম ও কিশমিশের মশ্রণ একটা প্লেটে ঢেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। বাদাম গুলো যখন রুম টেম্পারেচারে এসে যাবে তখন একটা ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের ইচ্ছা মত শেপে এগুলো কুচি করে কেটে নিতে হবে। আবার আপনার ইচ্ছা হলে ছুরি দিয়ে না কেটে বাদাম গুলো হামান দিস্তায় আধা ভাঙ্গা করে নিতে পাড়েন। তবে ছুরি দিয়ে কেটে নিলে সব রকম বাদাম গুলো প্রায় একই সাইজের হয়। এবং দেখতে ভাল লাগে।

৫ম ধাপ

এই বার ব্রেড গুলো টুকরা টুকরা করে কেটে নিতে হবে। এক কাপ মত ব্রেডের টুকরা লাগবে এই ব্রেড হালুয়া বানাবার জন্য। মোটামুটি চারটা থেকে পাঁচটা বড় সাইজ এর ব্রেড কেটে নিলেই এক কাপ মত ব্রেডের টুকরা পাওয়া যাবে।

৬ষ্ঠ ধাপ

একটা বড় কড়াতে বাকি ঘি টুকু নিতে হবে। ঘি গরম হয়ে গেলে এর মধ্যে ব্রেড এর টুকরা গুলা দিয়ে দিতে হবে। ব্রেড এর টুকরা গুলা লাল লাল করে ভেজে নিতে হবে। মোটামুটি তিন মিনিট থেকে চার মিনিট সময় লাগবে এই ব্রেড এর টুকরা গুলো লাল লাল করে ভাজা হতে। ব্রেড এর টুকরা গুলা একটু কড়া করে ভাজলে ভাল হয়। এই জন্য এগুলো ভাজার সময় চুলার আঁচ মিডিয়াম রাখতে হবে।

৭ম ধাপ

ব্রেড এর টুকরা গুলা যখন লাল লাল করে ভাজা হয়ে যাবে তখন এর মধ্যে আগে থেকে এলাচ দিয়ে ফুটিয়ে রাখা দুধ ঢেলে দিতে হবে। খুব ভাল ভাবে নেড়ে চেড়ে মিশিয়ে দিতে হবে। দুই মিনিট থেকে তিন মিনিটের মধ্যে ব্রেড এর টুকরা গুলো একদম নরম হয়ে যাবে। তখন খুনতি দিয়ে ভাল করে নেরে নেড়ে ব্রেড এর টুকরা গুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে দিতে হবে। এমন ভাবে এই কাজটা করতে হবে যেন ব্রেড এর কোন দলা না থাকে। বরং ব্রেড একদম গলে গিয়ে দুধ এর সাথে মিশে যায়। এই অবস্থায় আরো দুই মিনিট থেকে তিন মিনিট রান্না করতে হবে। কিচুক্ষণ পর দেখা যাবে ব্রেড হালুয়ার মিশ্রণ ঘন হতে শুরু করেছে।

এই অবস্থায় মাওয়া যোগ করতে হবে। মাওয়া যোগ করার পর আরো কিছুক্ষণ নেরে চেরে রান্না করতে হবে। এই সময় চুলার আঁচ একদম কমিয়ে দিতে হবে। কারণ ব্রেড হালুয়ার মিশ্রণ যেহেতু ঘন হয়ে এসেছে তাই যে কোন সময়ে হাড়ির তলায় লেগে যেতে পারে। এই জন্য চুলার জ্বাল একদম কমিয়ে অনবরত নাড়া চাড়া করে রান্নাটা করতে হবে। এই সময়ে আগে থেকে ভেজে কুচি করে রাখা বাদাম ও কিশমিশ গুলো মিশ্রণ ব্রেড হালুয়ার মধ্যে যোগ করতে হবে।  সেই সাথে কেশর ভেজানো গোলাপ জল ও কেওড়া জলের মিশ্রণও যোগ করে দিতে হবে। সব উপকরণ এক্ সাথে খুব ভাল ভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। ব্রেড হালুয়া পছন্দ মত ঘন হলে একটা সার্ভিং বোলে ঢেলে সার্ভ করতে হবে।

ব্রেড হালুয়া ঠান্ডা কিংবা গরম দুই ভাবেই খেতে ভাল লাগে। আপনি যদি ঠান্ডা ঠান্ডা হালুয়া খেতে চান তবে দুই ঘন্টা থেকে তিন ঘন্টা ফ্রিজে রেখে খেতে পাড়েন। সার্ভ করার সময় উপর থেকে আরো কিছু বাদাম কুচি ও কিশমিশ ছড়িয়ে সার্ভ করতে পাড়রেন। কিংবা ইচ্ছা হলে একটা কেশর দানা ছড়িয়েও সার্ভ করা যেতে পারে।

 

মন্তব্যসমূহ

আমি সাদিয়া রিফাত ইসলাম। একজন মা , হোমমেকার এবং ব্লগার। ভালভাসি রান্না করতে, বই পড়তে এবং লেখালেখি করতে।

মন্তব্য করুন