সহজ ও ভিন্ন স্বাদের পেপার লেমন রাইস রেসিপি

সহজ ও ভিন্ন স্বাদের পেপার লেমন রাইস রেসিপি

আমাদের দেশের মানুষের তিন বেলার প্রধাণ খাবার হচ্ছে রাইস কিংবা ভাত। অথচ সেই রাইস রান্নার মধ্যে কিন্তু ভিন্নতা খব কমই দেখা যায়। আর এর কারণও আছে। সাধারণত আমরা একটু ভিন্ন ভাবে রাইস রান্না করতে গেলে যে সকল রেসিপি অনুসরণ করি সেগুলো সবই প্রায় কঠিন ধরণের হয়ে থাকে। বেশির ভাগ রাইস রেসিপিই বেশ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে করতে হয়। ফলে সময় আর শ্রম দুটোই বেশি লাগে। ফলে অত বেশি ঝামেলা করে আর ভিন্ন ভিন্ন রাইস রেসিপি তৈরী করা হয়ে ওঠে না। আজ আমি আপনাদের এই সমস্যার একটা সহজ সমাধাণ দেব। এই সমাধাণটির নাম হচ্ছে সহজ, মজাদার ও ভিন্ন স্বাদের পেপার লেমন রাইস। এটি বানাতে যেমন সময় কম লাগে, তেমনি উপকরণও অনেক কম লাগে। আর এই দুটো জিনিস কম লাগে বলে পরিশ্রমও অনেক কম লাগে।

এর আগে আমি আপনাদের সাথে দক্ষিণী লেমন রাইস রেসিপি শেয়ার করেছিলাম। ঐ রেসিপিটি ছিল একটা অথেনটিক সাউথ ইন্ডিয়ান রেসিপি। কিন্তু আজ যেই পেপার লেমন রাইস রেসিপি শেয়ার করব সেটিকে আপনারা দক্ষিণী লেমন রাইসের বাংলাদেশি ভার্সন বলতে পাড়েন। এর কারণ হচ্ছে এই রেসিপিতে আমি সাধারণ বাঙ্গালী মশলা ব্যবহার করেছি। যদিও দক্ষিণী লেমন রাইসে সেখানকার অথেনটিক মশলা যেমন কারি পাতা, সরষে কিংবা হিং ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু এই সকল মশলা দিয়ে সাধারণত আমাদের দেশে রাইস রান্না করা হয় না। এই জন্য আমি এওসকল মশলার বদলে আমাদের দেশের সাধারণ রসুই ঘরে ব্যবহৃত পেঁয়াজ, রসুন কিংবার আদার মত মশলা ব্যবহার করেছি। আর সেই সাথে নাম দেখেই বুঝতে পারছেন যে এই রান্নাতে পেপার কিংবা গোল মরিচ ব্যবহার করা হয়েছে। যেহেতু বাঙ্গালির তেস্ট বাড একটু ঝাল ঝাল খাবার পছন্দ করার জন্য বিখ্যাত, তাই আমি এই রেসিপিতে দুই রকমের গোল মরিচ গুড়া ব্যবহার করেছি। আর সেই সাথে লেবু ব্যবহার করেছি ফলে একটা সুন্দর টক টক স্বাদ এসেছে।

আসুন কি কি উপকরণ কি কি পরিমাণে ব্যবহার করে এই পেপার লেমন রাইস বানাতে হবে তা জেনে নেয়া যাক।

পেপার লেমন রাইস বানাতে যে যে উপকরণ দরকার হবে

  • বাসমতি কিংবা পোলাও চাল ১ কাপ
  • পানি দেড় কাপ
  • সাদা তেল ১ টেবিল চামচ
  • ঘি ১ টেবিল চামচ
  • আস্ত বড় এলাচ ১টি
  • আস্ত ছোট এলাচ ২ টি
  • দারচিনি ছোট ১ টুকরা
  • লবঙ্গ ১টি
  • তেজপাতা ১টি
  • আস্ত শুকনা মরিচ ২টি
  • মিহি করে কুচি করে রাখা পেঁয়াজ ২ টেবিল চামচ
  • মিহি করে কুচি করে রাখা রসুন ১ চা চামচ
  • মিহি করে কুচি করে রাখা আদা ১ চা চামচ
  • মিহি করে কুচি করে রাখা কাঁচা মরিচ ১ চা চামচ
  • ভাজা জিরা গুড়া ১/২ চা চামচ
  • সাদা গোল মরিচ গুড়া ১ চা চামচ
  • কালো গোল মরিচ গুড়া ১ চা চামচ
  • লবণ পরিমাণ মত
  • চিনি ১/২ চা চামচ
  • লেবুর রস ২ চা চামচ
  • আস্ত কাজু বাদাম ৪ থেকে ৫টি
  • আস্ত কাঠ বাদাম ৪ থেকে ৫টি
  • আস্ত পেস্তা বাদাম ৪ থেকে ৫টি
  • আস্ত চিনা বাদাম ৪ থেকে ৫টি
  • কিশমিশ ৪ থেকে ৫টি

পেপার লেমন রাইস যে পদ্ধতিতে বানাতে হবে

১ম ধাপ

প্রথমেই ভাতটা রেডি করে নিলে ভাল হয়। এর কারণ হচ্ছে ভাতটা সিদ্ধ হবার পর আবারো ভাজতে হয়। সেই ভাজার আগে ভাতটা একটু ঠান্ডা হয়ে গেলে ভাল হয়। এর জন্য আগে চাল ভাল ভাবে ধুয়ে পরিস্কার করে একটা ঝাঝরিতে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। আমি এই রান্নাটার জন্য বাসমতি চাল কিংবা পোলাও চাল দুটোই ব্যবহার করে দেখতে পাড়েন। একটা হাড়িতে পানি ফুটতে দিতে হবে। পানি ফুটে উঠলে চাল দিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিতে হবে। চুলার আঁচও একদম কমিয়ে দিতে হবে। পানি শুলিয়ে চাল সিদ্ধ হয়ে গেলে চুলা বন্ধ করে দিতে হবে।

সাধারণত পোলাও চাল কিংবা বাসমতি চাল সম্পূর্ণ সিদ্ধ হবার জন্য চালের পরিমাণের দ্বিগুণ পানি লাগে। কিন্তু আমি এখানে যে পরিমাণ চাল নিয়েছি তার দেড় গুণ পানি ব্যবহার করেছি চাল সিদ্ধ করার জন্য। এর পিছনে একটা কারণ আছে। এই সিদ্ধ হয়ে যাওয়া চালটা এই রান্নার পরবর্তি ধাপে আবারো ঘ ও অন্যান্য মশলা সহযোগে ভাজা হবে। তখন সিদ্ধ চাল আরো কিছুটা রান্না হবে। তাই আমরা যদি আগে থেকেই চাল সম্পূর্ণ সিদ্ধ করে ফেলি তাহলে পেপার লেমন রাইস নরম ও কাদা কাদা হয়ে যাবে খেতে। চাল মোটামুটি সিদ্ধ হয়ে গেলে তা হাড়ি থেকে উঠিয়ে অন্য একটা পাত্রে রাখতে হবে। তা না হলে হাড়ির গরমে ভাতটা আরো নরম হয়ে যাবে।

২য় ধাপ

এই বার বাদাম ও কিশমিশ গুলো রেডি করে নিতে হবে। কিশমিশ গুলো একটা ছোট পাত্রে পানিতে ভিজিয়ে দিতে হবে। অন্তত ২০ মিনিট থেকে ২৫ মিনিট এগুলো ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে করে কিশমিশ গুলো পানি শোষণ করে ফুলে উঠবে। তারপর এগুলো পানি থেকে উঠিয়ে রাখতে হবে।

একটা ছোট ফ্রাইং প্যানে ১/২ চা চামচ ঘি গরম করতে হবে। ঘি গরম হলে এর মধ্যে আস্ত কাজু বাদাম, কাঠ বাদাম, চিনা বাদাম ও পেস্তা বাদাম ছেড়ে দিতে হবে। সেই সাথে আগে থেকে ভিজিয়ে পানি ঝরিয়ে রাখা কিশমিশ গুলোও দিয়ে দিতে হবে। হালকা করে এগুলো ভেজে নিতে হবে। খুব বেশি সময় ভাজার দরকার নেই। তাহলে বাদাম পুড়ে যেতে পারে। আর বাদাম ভাজার সময়ও চুলার আঁচ খুব কম রাখতে হবে। এবং অনবরত খুনতি দিয়ে বাদাম ও কিশমিশ গুলোর মিশ্রণ নাড়া চাড়া করতে হবে। তা না হলে বাদাম ও কিশমিশের মিশ্রণ হুট করেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুড়ে যেতে পারে।

৩য় ধাপ

এই বার একটা বড় করাতে সাদা তেল ও ঘি এক সাথে গরম করতে হবে। সাদা তেল ও ঘি গরম হয়ে গেলে এতে একে একে আস্ত শুকনা মরিচ, তেজপাতা আর বড় এলাচ ফোড়ন দিতে হবে। সেই সাথে ছোট এলাচ, দারচিনি ও লবঙ্গও ফোড়ন দিতে হবে।

ফোড়নের মশলা গুলো একটু ভাজা হয়ে যখন সুন্দর ফোড়নের গন্ধ আসা শুরু করবে তখন এর মধ্যে মিহি করে কুচি করে রাখা পেঁয়াজ দিয়ে দিতে হবে। পেঁয়াজ কুচি ভাজতে সময় তুলনা মুলক বেশি লাগে। তাই সব সময় শুরুতে পেঁয়াজ কুচি ভাজতে হয়। এর পরে আস্তে আস্তে অন্যান্য মশলা দেয়া উচিত। পেঁয়াজ কুচি একটু নরম হয়ে গেলে এর মধ্যে মিহি করে কুচি করে রাখা আদা, রসুন ও কাঁচা মরিচ দিয়ে দিতে হবে। অনেকেই খাওয়ার সময় মুখে আদার টুকরা পড়লে খুব বিরিক্ত বোধ করে থাকেন। আপনি যদি সেই দলের হয়ে থাকেন তবে আদা কুচির বদলে ১/২ চা চামচ আদা বাটা দিয়ে দেখতে পাড়েন। সেক্ষেত্রে পেঁয়াজ কুচি, রসুন কুচি ও কাঁচা মরিচ কুচি ভাজা হয়ে গেলে তখন আদা বাটা দিয়ে নেড়ে চেড়ে নিতে হবে।

মিহি করে কুচি করে রাখা মশলা গুলো লাল লাল করে ভেজে নিতে হবে। এরপর আগে থেকে আধা সিদ্ধকরে রাখা ভাত এর মধ্যে দিয়ে দিতে হবে। ভাল করে নেরে চেড়ে মিশিয়ে দিতে হবে। পরিমাণ মত লবণ ও চিনি যোগ করতে হবে। সেই সাথে ভাজা জিরা গুরা, সাদা গোল মরিচ গুড়া ও কালো গোল মরিচ গুড়াও যোগ করে দিতে হবে। খুব দ্রুত ভাল ভাবেনেড়ে চেড়ে মিশিয়ে দিতে হবে।

৪র্থ ধাপ

মশলার সাথে সিদ্ধ পোলাও চাল কিংবা বাসমতি চাল ভাও ভাবে মেশানো হয়ে গেলে আগে থেকে ভেজে রাখা বাদাম ও কিশমিশ গুলো যোগ করে দিতে হবে। আপনার যদি ইচ্ছা হয় তবে বাদাম গুলো আস্ত রাখতে পাড়েন। আবার ইচ্ছা হলে এগুলো ছোট ছোট করে কুচিও করে দিতে পাড়েন। আমি লম্বালম্বি ভাবে দুই ভাগ করে কেটে সব রকম বাদাম ব্যবহার করেছি। আমার মনে হয় যে কোন রাইস আইটেমে এই ভাবেই বাদাম ব্যবহার করলে খেতে ও দেখতে বেশি ভাল লাগে।

৫ম ধাপ

এরপর চুলা বন্ধ করে দিতে হবে। চুলা বন্ধ করে উপর থেকে লেবুর রস ছড়িয়ে দিতে হবে এবং ভাল ভাবে নেড়ে চেড়ে মিশিয়ে দিতে হবে। আসলে লেবুর রস দেবার পর কোন খাবার আগুনে বেশি সময় রাখা কিংবা রান্না করা উচিত না। এতে করে লেবুর সুন্দর মৃদু গন্ধটা নষ্ট হয়ে যায়। এজন্যই চুলা বন্ধ করে লেবুর রস দিতে হবে। রান্না করা পেপার লেমন রাইসের গরমেই এটি ভাল ভাবে সব কিছুর সাথে মিশে যাবে।

এরপর আপনার পছন্দ মত একটা সার্ভিং ডিশে ঢেলে সার্ভ করতে পাড়েন ভীষণ মজার, সহজ ও ভিন্ন স্বাদের পেপার লেমন রাইস। উপর থেকে একটু বাদাম ছড়িয়ে সাজিয়ে দিলেই হবে।

 

 

 

 

মন্তব্যসমূহ

আমি সাদিয়া রিফাত ইসলাম। একজন মা , হোমমেকার এবং ব্লগার। ভালভাসি রান্না করতে, বই পড়তে এবং লেখালেখি করতে।

মন্তব্য করুন