ঘরেই বানান হার্বাল হেয়ার অয়েল

ঘরেই বানান হার্বাল হেয়ার অয়েল

আমাদের দেশের মেয়েরা তাদের চুলের জন্য বিখ্যাত। বেশির ভাগ মেয়েদেরকেই স্রষ্টা এক রাশ ঘন কালো চুল দিয়ে ভাগ্যবতী করেছেন। তবে এই ঘন, কালো, লম্বা চুলের যত্ন নেয়াতাও কিন্তু বেশ কষ্টকর ব্যাপার। সেই সাথে সময় সাপেক্ষও বটে। একাওণেই অনেকেই আস্তে আস্তে এই সুন্দর চুলের সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেন। আর যাদ্র চুল এমনিতেই একটু খারাপ তাদের কথা না হয় নাই বললাম। আজ আপনাদের এই চুলের সমস্যার সমাধাণ নিয়ে হাজির হয়েছি। তাও আবার একদম ঘরোয়া সমাধাণ। সমাধাণটি হচ্ছে একটি হার্বাল হেয়ার অয়েল। এবং তাও আবার বাসায় বানানো।

আসলে বাজারে ঘুরলে বিভিন্ন কোম্পানির হার্বাল হেয়ার অয়েল কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু এই সব বাজার জাত পণ্য আসলে কত টুকু খাটি তা নিয়ে কিন্তু যথেষ্ঠ সন্দেহ করা যেতেই পারে। তার উপর এই সকল হার্বা হেয়ার অয়েল সবাইকে সব সময় স্যুটও করে না। তখন কিন্তু হিতে বিপরীত হয়। আমি এমন অনেককেই দেখেছি যারা না বুঝে মার্কেট থেকে কেনা হার্বাল হেয়ার অয়েল ব্যবহার করেছেন। এবং এর ফলে অকালে নিজের চুল গুলো নষ্ট করে ফেলেছেন। এই জন্য এই সব বাজার থেকে কেনা হার্বাল অয়েল ব্যবহার না করে আমাদের উচিত ঘরেই প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে হার্বাল হেয়ার অয়েল বানিয়ে নেয়া।

আমাদের দাদি নানিরাও কিন্তু বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন আলাদা আলাদা উপকরণ ব্যবহার করে হার্বাল হেয়ার অয়েল ব্যবহার করতেন। ঐ সকল তেল গুলো ছিল খাটি উপকরণ দিয়ে তৈরী। এবং ঐ সকল তেলে কোন রকম কেমিকেল কিংবা প্রিজারভেটিভ দেয়া থাকত না। একারণেই আমাদের দাদি নানি কিংবা মা খালাদের চুল ছিল এত সুন্দর। অথচ এখন বিভিন্ন কেমিকেল প্রোডাক্ট ব্যবহার করে দিন দিন আমরাই আমাদের চুলের ক্ষতি করে ফ্লছি। তাই আসুন এই সব কেমিকেল হেয়ার অয়েল ব্যবহার করা বাদ দিয়ে আজই ঘরে বসে হার্বাল হেয়ার অয়েল বানিয়ে নেই। আমি আজ যে হার্বাল হেয়ার অয়েল নিয়ে কথা বলব সেটি বেশ কয়েক রকম তেল ও মশলার মিশ্রণে বানানো হয়ে থাকে। আর এটি বানাবার নির্দিস্ট একটি প্রসেও আছে। আসুন সেগুলো কি এবং তেলটি বানাবার প্রসেস জেনে নেয়া যাক।

হার্বাল হেয়ার অয়েল বানাতে যা যা লাগবে

  • অলিভ অয়েল ১/৪ কাপ
  • নারকেল তেল ১/৪ কাপ
  • ক্যাস্টর অয়েল ১/৪ কাপ
  • আমন্ড অয়েল ১/৪ কাপ
  • কালো জিরা ২ টেবিল চামচ
  • মেথি ২ টেবিল চামচ

হার্বাল হেয়ার অয়েল যে পদ্ধতিতে বানাতে হবে

আগেই বলেছি এই হার্বাল হেয়ার অয়েল বানাবার একটা নির্দিস্ট প্রসেস আছে। আর এই প্রসেসটা মোটামুটি সাত দিন ধরে করতে হয়। না না সাত দিন ধরে প্রসেস করতে হবে ভেবে ঘাবড়াবেন না। এই হার্বাল হেয়ার অয়েল বানাবার প্রসেস খুবই সহজ। শুধু একটু সময় দিতে হবে মাত্র।

হার্বাল হেয়ার অয়েল বানাবার জন্য প্রথমেই কালো জিরা ও মেথি আলাদা আআদা ভাবে ভাল করে ধুয়ে পরিস্কার করে নিতে হবে। একটা ঝাঝরিতে রেখে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। কালো জিরা ও মেথি থেকে সম্পূর্ণ পানি ঝরে গেলে এগুলো একটা ঝাঝরিতে বিছিয়ে রোদে দিতে হবে। কম পক্ষে দুই ঘন্টা এগুলো রোদে রাখতে হবে। তারপর হাত দিয়ে একটু নেড়ে চেড়ে আবারো দুই ঘন্টার জন্য রোদে দিতে হবে। এই সময়ের মধ্যে কালো জিরা ও মেথি একদম শুকিয়ে যাবে। তখন এগুলো হার্বাল হেয়ার অয়ে বানাবার একদম উপযোগী হয়ে যাবে।

এই বার একটা পরিস্কার ও শুকনা কাঁচের বোতল নিতে হবে। এই বোতলে প্রথমে পরিস্কার করে রাখা শুকনা কালো জিরা ও মেথি ঢেলে দিতে হবে। এরপর একে একে নারকেল তেল, ক্যাস্টর অয়েল, অলিভ অয়েল ও আমন্ড অয়েল যোগ করতে হবে। সব তেল মিলিয়ে এক কাপ মত হবে। এই বার কাঁচের বোতলে ঢাকনা লাগিয়ে নিতে হবে। এবং বেশ জোরে জোরে বেশ কয়েক বার ঝাকি দিতে হবে। এরপর এই হার্বাল হেয়ার অয়েল রোদে দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত চার ঘন্তা থেকে পাঁচ ঘন্টা এই হার্বাল হেয়ার অয়েল রোদে রাখতে হবে। এই ভাবে ছয় দিন প্ররযন্ত এই হার্বাল হেয়ার অয়েল রোদে রাখতে হবে।

এই ভাবে ছয় দিন থেকে সাত দিন এই হার্বাল হেয়ার অয়েল রোদে রাখার একটা কারণ আছে। এটি এই ভাবে রোজ রোদে দিয়ে গরম করার ফলে কালো জিরা ও মেথির মধ্য থেকে পুষ্টি গুণ আস্তে আস্তে হার্বাল হেয়ার অয়েলের সাথে খুব ভাল মতন মিশে যাবে। ফলে এটি চুলে খুব ভাল কাজ করবে। এই ভাবে ছয় দিন রোদে দেবার পর এটি ব্যবহার উপযোগী হয়ে যাবে।

হার্বাল হেয়ার অয়েল যে পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে হবে

এই হার্বাল হেয়ার অয়েল অন্য যে কোন সাধারণ তেলের মতই মাথার তালু ও চুলে ব্যবহার করতে হবে। তবে এই হার্বাল হেয়ার অয়েল ব্যবহার করার আগে এক বোতলটি খুব ভাল মতন ঝাকিয়ে নিতে হবে। তারপর একটা ছোট বাটিতে নিয়ে তেলটি হালকা করে গরম করে নিতে হবে। এই উষম গরম তেল প্রথমে একটা তুলোর বলের সাহায্যে চুলের গোড়ায় মাথার তালুতে লাগাতে হবে। এর জন্য মাথার চুল সিথি করে ফাক ফাক করে তেল লাগাতে হবে। এই ভাবে পুরো মাথায় তেল লাগানো হয়ে গেলে হাত দিয়ে বাকি চুলে তেল লাগিয়ে নিতে হবে।

গোসল করার অন্তত দুই ঘন্টা থেকে তিন ঘন্টা আগে এই হার্বাল হেয়ার অয়েল মাথায় লাগিয়ে নিতে হবে। আরো ভাল হয় যদি আগের রাতে ঘুমাতে যাবার আগে এই হার্বাল হেয়ার অয়েল মাথায় তালু ও চুলে লাগিয়ে নেয়া যায়। এর পরে স্বাভাবিক নিয়মে চুলে শ্যামপু করে ধুয়ে নিতে হবে। মাত্র এক বার শ্যাম্পু করলে এই তেল চুল থেকে পুরোপুরি পরিস্কার হবে না। তাই তেল আথা থেক সম্পূর্ণ পরিস্কার হবার জন্য দুই বার থেকে তিন বার চুলে শ্যাম্পু করতে হবে। চুল থেকে এই তেল সম্পূর্ণ পরিস্কার হয়ে গেলে চুল হালকা শুকনা করে নিতে হবে। এর পরে চুলে সুন্দর করে কন্ডিশনার লাগিয়ে নিতে হবে। দুই মিনিট থেকে তিন মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। তারপর খুব ভাল ভাবে পানি দিয়ে চুল পরিস্কার করে নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন কোন ভাবেই চুলে কোন কন্ডিশনার লেগে না থাকে।

হার্বাল হেয়ার অয়েল ব্যবহার করার সতর্কতা

এই হার্বাল হেয়ার অয়েল ব্যবহার করতে হলে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।তাহলে বহু দিন পর্যন্ত এই হার্বাল হেয়ার অয়েল ভাল থাকবে। প্রথমত এই হার্বাল হেয়ার অয়েল অবশ্যই কোন কাঁচের বোতলে রাখতে হবে। আর কাঁচের বোতলটি অবশ্যই সম্পূর্ণ পরিস্কার ও শুকনা থাকতে হবে। কাঁচের বোতলে যদি আগে থেকে ময়লা কিংবা এক ফোটা পানিও থাকে তাহলে কিন্তু হার্বাল হেয়ার অয়েল নষ্ট হয়ে যাবে।

কালো জিরা ও মেথি তেলের মধ্যে মেশানোর আগে অবশ্যই সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিতে হবে। এউলোর সাথেও যদি সামান্য পানি লেগে থাকে তাহলে তেলটা পরবর্তিতে নশট হয়ে যাবে।

এই হার্বাল হেয়ার অয়েল মাসে দুই থেকে তিন বার দুই ঘন্টা থেকে তিন ঘন্টার জন্য রোদে দিতে হবে। এতে করে এই হার্বাল হেয়ার অয়েল দীর্ঘ দিন পর্যন্ত ভাল থাকবে।

এই হার্বাল হেয়ার অয়েল অবশ্যই পরিস্কার চুলে ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে যদি মাথায় ময়লা থাকা অবস্থায় এই হার্বাল হেয়ার অয়েল ব্যবহার করা হয় তাহলে এই দীর্ঘ সময় ধরে এই ময়লা তেলের সাথে মাথায় ত্বকের গভীরে ঢুকে যাবে। ফলে চুল পড়া, খুশকি সহ নানা রকম সমস্যার সৃষ্টি করবে।

হার্বাল হেয়ার অয়েলের উপকারিতা

এই হার্বাল হেয়ার অয়েলে ব্যবহৃত সব কটি উপকরণের আলাদা আলদা উপকারিতা আছে। সেগুলো এক এক করে নিচে উল্লেখ করা হল

নারকেল তেলের উপকারিতা

নারকেল তেলের প্রধাণ কাজ হল এটি আআদের চুলের গোড়া মজবুত করে। ফলে চুল সহজে পড়তে পারে না।

ক্যাস্টর অয়েলের উপকারিতা

ক্যাস্টর অয়েলেরও প্রধাণ কাজ হচ্ছে এটি চুলকে গোড়া থেকে মজবুত করে। ফলে যাদের চুল পড়ার সমস্যা আছে তাদের জন্য এই তেলটি খুব উপকারে আসে। শুধু তাই নয় এই ক্যাস্টর অয়েল আমাদের মাথায় নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করে থাকে। আর এটি আমাদের চুল সিল্কি ও ম্যানেজেবল করে রাখতেও যথেষ্ঠ কাজে দেয়।

অলিভ অয়েলের উপকারিতা

অলিভ অয়েল মূলত ফ্রিজি চুলের জন্য বেশি উপকারি। অলিভ অয়েল চুল থেকে ফ্রিজি ভাব দূর করে। সেই সাথে এটি চুলকে অনেক সিল্কি আর ঝরঝরে করে তোলে। বিশেষ করে যাদের চুল কোকরা তাদের চুলকে আরো বেশি ঝরঝরে ও ম্যানেজেবল করে তুলতে অলিভ অয়েল খুব ভাল কাজে দেয়।

আমন্ড অয়েলের উপকারিতা

আমন্ড অয়েল মূলত চুলকে উজ্জ্বল শাইনি করে তোলে। তাছাড়া এটি চুলকে মসৃণ ও ঝরঝরে রাখতেও সাহায্য করে থাকে।

কালো জিরার উপকারিতা

কালো জিরা মূলত চুলের গোড়া শক্ত করে। তাছাড়া এর মধ্যে থাকা বিভিন্ন জীবাণু নাশক উপাদান চুলকে বিভিন্ন রকম ছত্রাক বা ফাঙ্গাস এর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

মেথির উপকারিতা

মেথিও মূলত চুলের গোড়া শক্ত করে ও চুল পড়া রোধ করতে সাহায্য করে। সেই সাথে এটি নতুন চুল গজাতেও ভূমিকা পালন করে। মেথির আর একটি গুণ হচ্ছে এটি আমাদের মাথায় খুশকির হতে দেয় না। আর আগে থেকে মাথায় খুশকি থাকলে তা দূর করতেও সাহায্য করে থাকে।

 

মন্তব্যসমূহ

আমি সাদিয়া রিফাত ইসলাম। একজন মা , হোমমেকার এবং ব্লগার। ভালভাসি রান্না করতে, বই পড়তে এবং লেখালেখি করতে।

মন্তব্য করুন