পারফেক্ট গৃহিণী হবার জন্য কিছু সহজ কৌশল

পারফেক্ট গৃহিণী হবার জন্য কিছু সহজ কৌশল

আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা আছে। এই ভুল ধারণা গুলোর মধ্যে খুব কমন একটা ভুল ধারণা হচ্ছে ঘর সামলানো নারীদের নিয়ে। এই ধারণাটি হচ্ছে গৃহিণীরা খুব বেশি কাজ করে না। শুধু একটু খুনতি নেড়ে রান্না করা ব্যাস। এই তাদের কাজ। আর এই ধারণাটা শুধু আমাদের দেশের মানুষের মধ্যেই যে আছে তা কিন্তু নয়। আমার তো মনে হয় পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই গৃহিণীদের সম্পর্কে এমন ধারণাই পোষণ করা হয়ে থাকে। অথচ একজন গৃহিণী মাত্রই জানেন তাদের কাজ কিন্তু কম নয়। বরং একজন ১০টা থেকে ৬টা কাজ করা কোন কর্মজীবী মানুষের থেকে তার কাজের পরিমাণ আর চাপ দুইটাই বেশি। আর এই অতিরিক্ত কাজের চাপে অনেক গৃহিণীই দিনের শেষে একদম হাপিয়ে ওঠেন। মনে হয় দিনটা কেন ২৪ ঘন্টায় শেষ হয়ে যায়? আর দুইটা ঘন্টা বেশি হলে কি এমন ক্ষতিই বা হত?

অথচ আপনি যদি কিছু সাধারণ কৌশল খাটাতে পাড়েন তাহলে কিন্তু এই সমস্যা আর থাকে না। আমি আজ এরকম কিছু ছোট ছোট ঘরোয়া কৌশল নিয়েই আলোচনা করব। না আমি কোন ঘরোয়া কাজের টিপস আপনাকে দিব না। বরং আমি কিছু সহজ কর্ম পন্থা নিয়ে আপনাদের সাথে আলোচনা করব। আসলে যে কোন কাজ তা সে সাধারণ ঘরোয়া কাজই হোক কিংবা বড় কোন ব্যবসার কাজই হোক, সব কিছুর জন্য চাই সঠিক ও সময় উপযোগী পরিকল্পনা। একই কথা খাটে একজন গৃহিণীর ক্ষেত্রেও।। তাই আপনি যদি একজন পারফেক্ট গৃহিণী হতে চান তাহলে এখনি একটা সঠিক ও সুগঠিত পরিকল্পনা আপনাকে রেডি করে নিতে হবে। আমার এই আর্টিকেলটা আপনাকে সেই ব্যাপারেই সাহায্য করবে। আমি এই আর্টিকেলে পারফেক্ট গৃহিণী হয়ে ওঠার কিছু কৌশল নিয়ে আলোচনা করব। আসুন দেরি না করে কৌশল গুলো জেনে নেই।

১। পারফেক্ট গৃহিণী হবার জন্য প্রথমেই আপনার প্রায়োরিটি সেট করুন

আমার মতে একটা পরিবারকে যদি একটা গাড়ির সাথে তুলনা করা হয় তাহলে সেই গাড়ির ইঞ্জিন হচ্ছেন সেই পরিবারের গৃহিণী। কারণ একটা পরিবারের সকল সদস্যের সুবিধা অসুবিধা থেকে শুরু করে তাদের সমস্ত কিছুর দেখভালের দায়িত্ব সাধারণত এক জন গৃহিণীর হাতেই থাকে। এজন্য একজন গৃহিণীর জন্য তার পরিবারের সুখ দুঃখের খেয়াল রাখাটা খুবই জরুরী। আর আমার মতে এটাই হচ্ছে একজন পারফেক্ট গৃহিণী হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ। তাই যে কোন পরিকল্পনা নেবার আগে একটা কথা মাথায় রাখতে হবে। সেটি হচ্ছে ‘আমার পরিবারের সুখটা সবার আগে আমার কাছে মুখ্য, তারপর অন্য কাজ’। এরপর আপনার পরবর্তি পরিকল্পনার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

২। প্রতি দিনের কাজের একটা লিস্ট তৈরী করুন

আপনার প্রতিদিনের কাজের একটা লিস্ট তৈরী করুন। এবং চেষ্টা করুন এই লিস্ট বানাবার কাজটা আগের রাতে সেরে ফেলতে। আপনার কাজের লিস্টের মধ্যে আপনার ছোট বড় সব কাজকেই যোগ করুন। যেমন রান্না করা, ঘর পরিস্কার করা, রান্নাঘর পরিস্কার করা, ঘর গোছানো, বাচ্চাকে স্কুলে দেয়া নেয়া ইত্যাদি সব কিছুই লিখে রাখুন। আবার প্রতি বেলা আলাদা আলাদা ভাবে কি কি রান্না করবেন এটাও পরিকল্পনা করে ফেলুন।

সেই সাথে আর একটা কাজ করতে পাড়েন। প্রতিটা কাজ করতে আপনার কেমন সময় লাগতে পারে সেটা ঐ কাজের পাশে লিখে রাখুন। যেমন আপনার শোবার ঘর গোছাতে ১০ মিনিট সময় লাগবে। কিংবা সকালের নাস্তা বানাবার জন্য আপনার আধা ঘন্টা থেকে ৪৫ মিনিট সময় লাগবে। এই সময়ের একটা হিসাব আপনার কাজের পাশে লিখে রাখুন। এতে করে দুইটা সুবিধা হবে। সারা দিনে আপনার কাজ শেষ করতে আসলে কত টুকু সময় লাগবে সে সম্পর্কে আপনার একটা ধারণা তৈরী হয়ে যাবে। সেই সাথে কোন কাজে কত টুকু সময় বাচানো যেতে পারে সে ব্যাপারেও আস্তে আস্তে একটা ধারণা তৈরী হয়ে যাবে।

আর আপনার যদি নতুন বিয়ে হয়ে থাকে তাহলে তো এই লিস্ট বানাবার কাজটা আরো বেশি জরুরী। কারণ নতুন করে শুরু করা যে কোন কাজই শুরুতে একটু গড়বড় হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একটা সঠিক লিখি পরিকল্পনা আপনা সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারবে। আর আপনি কি কি কাজ পাড়েন এবং নতুন করে কি কি কাজ শিখতে চান সেটাও একটি লিস্টে লিখে রাখতে পাড়েন।

৩। ঘর পরিস্কার রাখা

একটি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ঘর সেই বাসার মানুষের রুচির পরিচয় বহন করে। তাই একজন পারফেক্ট গৃহিণী হতে গেলে আপনাকে অবশ্যই আপনার ঘর সব সময় পরিস্কার রাখতে হবে। আর এটা শুধু রুচির ব্যাপারই নয়। পরিবারের সকল সদস্যের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও ঘর দোড় সব সময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তবে একা একজন মানুষের পক্ষে সারা বাড়ি সব সময় পরিস্কার রাখা কখনোই সম্ভব নয়। তাই আপনার উচিত হবে বাসার সদস্যদের মধ্যে ঘর পরিস্কারের কাজটা ভাগ করে দেয়া। যেমন যে যার নিজের ঘরটাকে পরিস্কার রাখবে। সেই সাথে যার যার নিজস্ব বাথরুমও তাক দিয়েই সপ্তাহ্র এক বার থেকে দুই বার পরিস্কার করিয়ে নিতে পাড়েন। এতে করে আপনার ঘর সব সময় পরিস্কার থাকবে। এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও পরিস্কার থাকার প্রবণতা ও অভ্যাস গড়ে উঠবে। তবে এই ধরণের কাজ ভাগ করে দেবার আগে পরিবারের সদস্যদের বয়স বিবেচনা করে নিবেন। শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের তুলনামূলক সহজ কাজ গুলো করতে দিবেন।

৪। ঘর গুছিয়ে রাখা

একজন পারফেক্ট গৃহিণীর আর একটা লক্ষণ হল সাজানো গোছানো সুন্দর ঘর। তবে বাসায় বাচ্চা থাকলে ঘর গুছিয়ে রাখাটা বেশ কষ্টকর কাজ হয়ে যায়। আর বাচ্চা যদি একটু ছোট হয় তাহলে সেই কাজটা শুধু কষ্টকর নয়, বরং দূরহ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে একটা টিপস হচ্ছে প্রত্যেকটা জিনিসের জন্য একটা নির্দিস্ট জায়গা থাকতে হবে। আর কোন জিনিস এলোমেলো হয়ে আছে তা চোখে পড়লেই আগে জায়গার জিনিস জায়গায় রেখে দিতে হবে। পরে সব এক সাথে গুছাবো এই কথা চিন্তা করে জিনিস পত্র আগোছালো ভাবে ফেলে রাখলে তা শুধু আপনার কাজই বাড়াবে। আর ঘরও কখনোই পুরোপুরি গোছানো হবে না। তাই ঘর বেশি আগোছালো হবার আগেই তা আবার গুছিয়ে ফেলুন। আপনার সময় ও শ্রম দুটোই বেচে যাবে।

৫। নিজেকে সময় দিন

একজন পারফেক্ট গৃহিণী হতে গিয়ে নিজেকে ভুলে গেলে চলবে না। কারণ দিনের শেষে যখন আয়নার সামনে আপনি দাড়াবেন তখন আয়নায় কিন্তু আপনার নিজের মুখই দেখা যাবে। তখন যদি নিজেকে দেখে আপনার মন খারাপ হয়ে যায় তাহলে তার প্রভাব কিন্তু আপনার সংসারেও পড়বে। তাই সকল কাজের ভীড়ে নিজের জন্য একটু অবসর রাখুন। এই সময়টা নিজের যত্ন করুন। একটু ত্বকের যত্ন নিন, একটু চুলের যত্ন নিন। সম্ভব হলে মাঝে মাঝে পার্লারে গিয়ে নিজের পছন্দ মত কোন একটা ট্রিটমেন্ট নিয়ে নিজেকে একটু প্যাম্পার করে আসুন। কিংবা বিকেলে একটু সময় শুধু নিজের জন্য রাখুন। বারান্দায় এক কাপ চা হাতে নিয়ে প্রকৃতির সাথে একটু সময় কাটান। কিংবা এক কাপ গরম গরম কফি নিয়ে আর একটা প্রিয় কবিতা বই নিয়ে একা বসে পড়ুন। কিংবা অনেক দিন পর নিজের প্রিয় কোন মুভি দেখতে বসে পড়ুন। দেখবেন নিজেকে দেয়া এই ছোট ছোট উপহার গুলোই আপনাকে বহু দিনের জন্য এনার্জি যোগাবে।

৬। ইতিবাচক চিন্তা চেতনার অধিকারি হোন

কিছু মানুষের স্বভাব আছে সব কিছুতেই আগে নেতিবাচক ধারণা তৈরী করে নেবার। এই ধরণের মানুষেরা নিজে তো কখনোই সুখি হতে পাড়েন না। বরং সেই সাথে নিজের আশে পাশের মানুষের জীবনেও অশান্তি বয়ে নিয়ে আসেন। এজন্য জীবনের সকল পর্যায়ে ইতিবাচক চিন্তা ভাবনার প্রকাশ ঘটাতে হবে। জীবনে যতই বাধা আর বিপত্তি আসুক না কেন, শক্ত হাতে হাসি মুখে তা সামলানোর প্রতিজ্ঞা করতে হবে। মনে রাখতে হবে সমস্যা তো আমাদের জীবনেরই একটা অংশ। এটাকে আমরা ঠান্ডা মাথায় সামলাব নাকি কান্নাকাটি করে সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলব তা সম্পূর্ণ আমাদের হাতে। তাই জীবএর সকল অবস্থায় ইতিবাচক মনোবল ধারণ করতে হবে। আপনার এই ইতিবাচক চিন্তা ধারা শুধু আপনার জন্য সুফল বয়ে আনবে তা কিন্তু না। এই চিন্তা ধারা আপনার পরিবারের অন্য সদস্যদেরকেও বিশেষ করে আপনার সন্তানদেরকে ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করার অনুপ্রেরণা যোগাবে।

৭। কিছু মজার ও আনকমন রান্না শিখে রাখুন

আমাদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে। সেটি হচ্ছে ছেলেদের মনের রাস্তা তাদের পেট হয়ে যায়। কথাটা কিন্তু শুধু ছেদের ক্ষেত্রে খাটে তা কিন্তু নয়। ছেলে মেয়ে, ছোট বড় নির্বিশেষে সকল মানুষের ক্ষেত্রেই এই কথাটা একদম সঠিক। তাই কিছু মজাদার খাবার কিভাবে রান্না করতে হয় তা অবশ্যই শিখে রাখুন। আর সেই সাথে অতিথিদের তাক লাগিয়ে দেবার জন্য শিখে রাখুন কিছু আনকমন রান্না। আর এখন ইন্টারনেটের যুগে কোন কিছু শেখা তো একদম সেকেন্ডের ব্যাপার। একটু কষ্ট করে ইউটিউব খুলুন। আর পছন্দ মত রান্নার নাম সার্চ দিয়ে দেখে শিখে ফেলুন।

পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই। পারফেক্ট গৃহিণী শব্দটা শুনে অনেক কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু চেষ্টা করলে ব্যাপারটা মোটেও কঠিন না। শুধু চাই একটূ পরিকল্পনা আর নিজের পরিবারের প্রতি অসীম ভালবাসা আর মমতা।

মন্তব্যসমূহ

আমি সাদিয়া রিফাত ইসলাম। একজন মা , হোমমেকার এবং ব্লগার। ভালভাসি রান্না করতে, বই পড়তে এবং লেখালেখি করতে।

মন্তব্য করুন