ভিন্ন স্বাদের নারকেলের দুধের পায়েস

ভিন্ন স্বাদের নারকেলের দুধের পায়েস

আমাদের দেশের সব থেকে বেশি প্রচলিত ডেজার্ট আইটেম হচ্ছে ক্ষীর বা পায়েস। ঈদ হোক কিংবা পূজা, বিয়ে হোক কিংবা জন্ম দিন, যে কোন অনুষ্ঠানে বাঙ্গালী খাবার টেবিলে পায়েস তো থাকবেই। আসলে যে কোন ভারী খাবারের সাথে শেষ পাতে আমাদের একটু মিষ্টি না হলে যেন চলেই না। আর এই মিষ্টি খাবারটি যদি হয় পায়েস তাহলে তো কথাই নেই। খাবার টেবিলে বসা প্রত্যেকটি মানুষের মুখেই হাসি ফুটে ওঠে। তবে আমরা পায়েস বানাবার সময় ঘুরে ফিরে কিন্তু সেই একই রকম পায়েসই বানিয়ে থাকি। এই পায়েস হচ্ছে সাধারণ চালের পায়েস। তবে আজ আমি এই সাধারণ পোলাও চালের পায়েস এরই একটা ভিন্ন ধরণের রেসিপি আপনাদের সাথে শেয়ার করব। সেটি হচ্ছে নারকেলের দুধের পায়েস।

নারকেলের দুধের পায়েস হচ্ছে আমাদের বাসায় রোজকার বানানো সাধারণ পোলাও এর চালের পায়েসেরই একটু ভিন্ন ধরণ। এই পায়েসের ভিন্নতা হচ্ছে এতে গরুর দুধের সাথে বেশ খানিকটা পরিমাণে নারকেলের দুধ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে এই পায়েসের স্বাদে অনেকটা ভিন্নতা চলে আসে। নারকেলের দুধ ব্যবহার করার ফলে এই পায়েস খেতে অনেক বেশি ক্রীমি আর টেস্টি হয়। এই একটা মাত্র উপকরণ যোগ করার ফলে এই পায়েসে একটা শাহি ভাব চলে আসে।

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা পিউর ভেজিটেরিয়ান হবার কারণে গরুর দুধ খান না। আবার অনেকেই আছেন যাদের ডেয়ারি প্রোডাক্টে এলার্জি আছে। অনেকের আবার গরুর দুধে সমস্যা আছে। যেকারণে গরুর দুধ খেলে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স এর কারণে তারা সেটা হজম করতে পাড়েন না। এই সকল ব্যক্তিরা না চাইতেও পায়েস এর মত মজার একটা খাবার থেকে সব সময় বঞ্চিত হয়ে থাকেন। তাদের ক্ষেত্রে পায়েস খাওয়ার একটা উপায় হতে পারে এই নারকেলের দুধের পায়েস। যদিও আমি এই রেসিপিতে গরুর দুধ ও নারকেলের দুধ দুই রকমই ব্যবহার করেছি। তবে আপনার যদি গরুর দুধ খেতে কোন রকমের সমস্যা থেকে থাকে তাহলে গরুর দুধের বদলে নারকেল্র দুধের পরিমাণটা একটু বাড়িয়ে দিয়েও আপনি এই নারকেলের দুধের পায়েস রান্না করে দেখতে পাড়েন।

নারকেলের দুধের পায়েস বানাতে যা যা উপকরণ দরকার হবে

  • পোলাও চাল ১/৪ কাপ
  • গরুর দুধ ১ কাপ
  • নারকেলের দুধ দেড় কাপ
  • গুড় কিংবা ব্রাউন সুগার ১/৪ কাপ
  • এলাচ ১টি
  • ঘি ৩ টেবিল চামচ
  • কিশমিশ ১০ থেকে ১২টি
  • কাজু বাদাম ১০ থেকে ১২টি
  • পেস্তা বাদাম ১০ থেকে ১২টি
  • চিনা বাদাম ১০ থেকে ১২টি
  • কাঠ বাদাম ১০ থেকে ১২টি
  • গোলাপ জল ১/২ চা চামচ
  • কেওড়া জল ১/২ চা চামচ
  • মিঠা আতর ১ ফোটা থেকে ২ ফোটা
  • কেশর ১০ থেকে ১২ দানা

নারকেলের দুধের পায়েস যে পদ্ধতিতে বানাতে হবে

১ম ধাপ

প্রথমে পায়েসের জন্য পোলাও চাল রেডি করে নিতে হবে। এর জন্য পোলাও চাল হুব ভাল মত ধুয়ে নিতে হবে। এরপর একটা পাত্রে পানি নিয়ে তাতে পরিস্কার চাল ভিজিয়ে রাখতে হবে। কম পক্ষে দুই ঘন্টা থেকে তিন ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। দুই ঘন্টা থেকে তিন ঘন্টা পর চাল গুলো থেকে পানি ঝরিয়ে দিতে হবে। এরপর শীল পাটায় পোলাও চাল গুলো বেটে নিতে হবে। ইচ্ছা হলে ব্লেন্ডারেও পিশে নিতে হবে। এক দম মিহি করে পেস্ট করার দরকার নেই। হালকা দানা দানা ভাব থাকলে খেতে বেশি ভাল লাগবে। আসলে এই ভাবে পোলাও চাল একটু ভেঙ্গে নিলে তা সিদ্ধ হতে খুব কম সময় লাগে। আর সেই সাথে এই পায়েস বানাতে দুধও তুলনা মুলক কম দরকার হয়।

একই সাথে এই সময়ে একটা ছোট পাত্রে গোলাপ জল ও কেওড়া জল নিয়ে নিতে হবে। এর মধ্যে কেশর দানা গুলো ভিজিয়ে দিতে হবে। কেশর যে কোন রান্নায় ব্যবহার করার আগে কিছু সময় ভিজিয়ে রাখতে হয়। এতে করে কেশরের ফ্লেভার ও রঙ দুটাই ভাল আসে।

২য় ধাপ

এই বার পায়েসের জন্য বাদাম ও কিশমিশ রেডি ক০রে নিতে হবে। তার জন্য কিশমিশ গুলো প্রথমে কিছুটা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবেকম পক্ষে ২০ মিনিট থেকে ২৫ মিনিট কিশমিশ গুলো পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এই সময়ের মধ্যে কিশমিশ গুলো পানি শোষণ করে ফুলে উঠবে। তখ এগুলো থেকে পানি ঝরিয়ে রেখে দিতে হবে।

এই বার একটা ফ্রাইং প্যানে ঘি গরম করতে দিতে হবে। ঘি হালকা গরম হয়ে গেলে এর মধ্যে কাজু বাদাম, কাঠ বাদাম, চিনা বাদাম ও পেস্তা বাদাম দিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে পানি ঝরিয়ে রাখা কিশমিশও দিয়ে দিতে হবে। হালকা আঁচ দুই মিনিট থেকে তিন মিনিট বাদাম ও কিশমিশ গুলো ভেজে নিতে হবে। খুব বেশি সময় ভাজার দরকার নেই। বাদাম বেশি ভাজা হয়ে গেলে কড়া হয়ে যায়। তখন সেগুলো ডেজার্টে দিলে আর ভাল লাগে না। এরপর চুলা বন্ধ করে বাদাম ও কিশমিশ গুলো একটা প্লেটে উটিয়ে রাখতে হবে।

বাদাম ভাজা হয়ে যাবার পর দশ মিনিট থেকে পনেরো মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে বাদাম গুলো ঠান্ডা হয়ে আবে। তখন এগুলো নিজের পছন্দ মত শেপে কেটে নিতে হবে। আপনি ইচ্ছা হলে একদম কুচি কুচি করেও কাটতে পাড়েন। আবার ইচ্ছা হলে বাদাম গুলো মাঝখান থেকে লম্বালম্বি অর্ধেক করেও কেটে নিতে পাড়েন। তবে পায়েসের সাথে বাদাম কুচি কুচি করে কেটে দিলেই খেতে বাশি ভাল লাগবে।

৩য় ধাপ

এই বার একটা বড় সস প্যানে গরুর দুধ গরম করতে হবে। গরুর দুধ ফুতে উঠলে চুলার আঁচ কমিয়ে দিতে হবে। এরপর এর মধ্যে নারকেলের দুধ যোগ করতে হবে। বেশ কিছুক্ষণ এই দুই রকম দুধ এর মিশ্রণ ফুটতে দিতে হবে। চার মিন্নিট থেকে পাঁচ মিনিট দুধ ফুটানোর পর এটা কিছুটা ঘন হয়ে আসবে। তখন এই দুধের মধ্যে আগে থেকে বেটে আধা ভাঙ্গা করে রাখা পোলাও চাল দিয়ে দিতে হবে। এই সময় চুলার জ্বাল এক দম কম রাখতে হবে। তা না হলে দুধ সস প্যানের নিচে লেগে যেতে পারে। নেড়ে চেড়ে বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে রান্না করতে হবে।

৪র্থ ধাপ

পোলাও চাল সিদ্ধ হয়ে আসলে আর পায়েস একটু ঘন হয়ে আসলে এর মধ্যে গুড় যোগ করে দিতে হবে। আপনি আখের গুড় কিংবা খেজুড় গুড় দুইটাই ব্যবহার করে দেখতে পাড়েন। আবার আপনার কাছে যদি এই দুই ধরণের গুড় না থাকে তাহলে এগুলোর বদলে ব্রাউন সুগারও ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেকে আবার গুড়ের পায়েস খেতে পছন্দ করেন না। সেক্ষেত্রে আপনি গুড়ের বদলে চিনিও ব্যবহার করে দেখতে পাড়েন।

এই নারকেলের দুধের পায়েসে স্বাভাবিকের থেকে একটূ কম পরিমাণে গুড় কিংবা চিনি ব্যবহার করতে হয়। কারণ নারকেলের দুধ এমনিতেই গরুর দুধ থেকে একটু বেশি মিষ্টি হয়ে থাকে। তবে খাবারে মিষ্টির পরিমাণ পুরোটাই যার যার নিজের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। এই জন্য আপনি আপনার ইচ্ছা মত গুড় কিংবা চিনি ব্যবহার করতে পারেন।

৫ম ধাপ

এই বার নারকেলের দুধের পায়েসের মধ্যে আগে থেকে ভেজে কুচি করে কেটে রাখা বাদাম ও কিশমিশ গুলো যোগ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে কেশর ভিজিয়ে রাখা গোলাপ জল ও কেওড়া জলের মিশ্রণ যোগ করে দিতে হবে। খুব ভাল ভাবে মিশিয়ে নিতে হবে যাতে করে এই উপকরণ গুলো খুব ভাল মত সম্পূর্ণ নারকেলের দুধের পায়ে এ মিশে যেতে পারে। এরপর চুলা বন্ধ করে দিতে হবে। চুলা বন্ধ করে দেবার পর এর মধ্যে মিঠা আতর যোগ করতে হবে। এবং খুব ভাল ভাবে সম্পূর্ণ পায়েসে মিশিয়ে দিতে হবে। নারকেলের দুধের পায়েসের মধ্যে মিঠা আতর যোগ করাটা সম্পূর্ণ অপশনাল। আপনার কাছে যদি মিঠা আতর না থাকে কিংবা মিঠা আতরের ফ্লেভার যদি আপনার কাছে কড়া মনে হয় তবে এটি পায়েসে না দিলেও চলবে।

ব্যাস রেডি আপনার জন্য মজাদার ও শাহি স্বাদ এর নারকেল্র দুধের পায়েস। আপনার পছন্দ মত পাত্রে সার্ভ করে উপর থেকে বাদাম কুচি ছড়ীয়ে সাজিয়ে দিন। আর গরম গরম কিংবা ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।

 

মন্তব্যসমূহ

আমি সাদিয়া রিফাত ইসলাম। একজন মা , হোমমেকার এবং ব্লগার। ভালভাসি রান্না করতে, বই পড়তে এবং লেখালেখি করতে।

মন্তব্য করুন