তৈলাক্ত ত্বকের জন্য একটি জরুরি ফেস প্যাক

তৈলাক্ত ত্বকের জন্য একটি জরুরি ফেস প্যাক

আমাদের মধ্যে তিন ধরণের ত্বক দেখা যায় মেয়েদের মধ্যে। সেগুলি হচ্ছে শুষ্ক ত্বক, তৈলাক্ত ত্বক আর মিশ্র ত্বক। এখন গরম কাল এসে গেছে। এই সময়ে সব থেকে বেশি ত্বক নিয়ে ঝামেলায় পড়ে তৈলাক্ত ত্বকের অধিকারিরা। গরমের দিনে তৈলাক্ত ত্বক থেকে অন্য সময় থেকে বেশি তেল নিস্বরণ হতে থাকে। ফলে ত্বক এর তেলতেলে ভাব বেড়ে যায়। আর এই ত্বকের তেল তেলে ভাবের সাথে বাড়তে থাকে ব্রণ ও একনের সমস্যা। কারণ ত্বকে যখন অতিরিক্ত তেল থাকে তখন সাধারণ সময় থেকে বেশি ময়লা আর জীবাণু ত্বকের মধ্যে আটকে যায়। আর এই অতিরিক্ত ময়লা আর জীবাণুই ত্বক ব্রণ আর একনের প্রকোপ দিন দিন বাড়িয়ে তোলে। তাই এই গরমে ত্বক থেকে অতিরিক্ত তেল করাটাই হচ্ছে ত্বক ভাল রাখার প্রধাণ উপায়। তাই এই সময়ে এমন কোন ফেস প্যাক আমাদের নিয়ম করে ব্যবহার করা উচিত যাতে করে আমাদের ত্বক থেকে বাড়তি তেল আস্তে আস্তে কমে যায়। এতে করে অন্যান্য সমস্যাও আস্তে আস্তে কমে যাবে।

তৈলাক্ত ত্বকের প্রধান সমস্যা হচ্ছে আপনি যতই পরিস্কার করুন না কেন একটা সময় পরে আবারো আপনার ত্বকে নতুন করে তেল তৈরী হতে শুরু করবে। কোন ধরণ এর ক্রীম কিংবা পাউডার আপনাকে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারবে না। এই অতিরিক্ত তেল তৈরী হওয়া সমস্যার এক মাত্র সমাধাণ হতে পারে প্রাকৃতিক উপকরণ। আমাদের আশে পাশে প্রকৃতি অনেক উপকরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে যেগুলো ব্যবহার করে আমরা খুব সহজেই আমাদের ত্বক এর অনেক কানি যত্ন নিতে পারি। আর এই যত্ন নেবার জন্য যখন প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয় তখন তা তেমন কোন খরচের কারণও হয়ে দাঁড়ায় না। অথচ আমাদের ত্বকের সমস্যা গুলো কত সহজেই না দূর হয়ে যায়। হয়ত একটু সময় বেশি লাগে। কিন্তু এর ফ হয় দীর্ঘস্থায়ী আমাদের ত্বক হয়ে ওঠে প্রাক্ররতিক ভাবে সুস্থ আর সুন্দর। আজ আমি আপনাদের সাথে এমনি একটি ফেস প্যাক নিয়ে আলোচনা করব। এই ফেস প্যাকটি আপনারা খুব সহজেই ঘরে বসে বানিয়ে ত্বক থেকে অতিরিক্ত তৈলাক্ততা দূর করে নিতে পারবেন।

ফেস প্যাক বানাবার জন্য যে যে উপকরণ দরকার হবে

বেসন ১ চা চামচ

মুলতানি মাটি ১ চা চামচ

টক দই ১ চা চামচ

লেবুর রস ১ চা চামচ

ফেস প্যাক যে পদ্ধতিতে বানাতে হবে

ত্বক এর তৈলাক্ততা দূর করার জন্য বানানো এই বিশেষ ফেস প্যাকটি বানাবার জন্য আমাদের প্রথমে একটি ছোট বাটিতে বেসন ও মুলতানি মাটি নিতে হবে। এর পরে এই দুটি উপকরণ একে অন্যের সাথে হালকা করে মিশিয়ে দিতে হবে। তারপর এর মধ্যে মেশাতে হবে টক দই। যেহেতু এই উপকরণটি একটু ঘন তাই এটি মেশানোর সময় একটু দলা পেকে যেতে পারে। তাই খুব ভাল করে আগে টক দই এর সাথে বেসন ও মুলতানি মাটির স্মুথ পেস্ট তৈরী করে নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন কোন দলা পেকে না যায়। এর পরে এর মধ্যে লেবুর রস যোগ করতে হবে। এবং খুব ভাল ভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। খুব সুন্দর স্মুথ একটি পেস্ট তৈরী হবে। এই ফেস প্যাক বানাবার সাথে সাথেই ত্বকে ব্যবহার করতে হবে।

ফেস প্যাক যে পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে হবে

এই ফেস প্যাক ব্যবহার করার জন্য আলাদা তেমন কোন নিয়ম নেই। অন্য যে কোন ফেস প্যাক যেই পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে হয়, এই ফেস প্যাকটিও ঠিক একই ভাবে ব্যবহার করতে হবে। তবে যে কোন ধরণ এর ফেস প্যাকই হোক না কেন তা অবশ্যই পরিস্কার ও শুকনা ত্বকে ব্যবহার করতে হবে। এই কারণে এই ফেস প্যাক ব্যবহার করার আগে অবশ্যই ফেস ওয়াশ ব্যবহার করে মুখ ও গলার ত্বক খুব ভাল করে পরিস্কার করে নিতে হবে। এর পরে একটা পরিস্কার ও শুকনা তোয়ালে ব্যবহার করে মুখ ও গলার ত্বক একদম শুকনা করে মুছে নিতে হবে।

এই বার আপনার মুখ ও গলার শুকনা ও পরিস্কার ত্বক এর উপর সমান ভাবে এই বেস দিয়ে বানানো ফেস প্যাকটী লাগিয়ে নিতে হবে। তার পরে অপেক্ষা করতে হবে ২০ মিনিট থেকে ২৫ মিনিট। এই ২০ মিনিট থেকে ২৫ মিনিট টাইমের মধ্যেই এই ফেস প্যাক মুখ ও গলার ত্বক এর উপর একদম শুকিয়ে যাবে। যদি এই সময় এর মধ্যে ফেস প্যাকটি না শুকায় তবে আপনি আরো ৫ মিনিট থেকে ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে পারেন। এই সময় এর মধ্যে ফেস প্যাক অবশ্যই শুকিয়ে যাবে।

মুখ ও গলার ত্বক এর উপর ফেস প্যাক সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে বুঝতে হবে আপনার স্কিন এই ফেস প্যাক থেকে যত টুকু সম্ভব সম্পূর্ণ পুষ্টি নিয়ে নিয়েছে। তখন আপনার হাতে অল্প একটু পানি নিয়ে ফেস প্যাকটি হালকা করে ভিজিয়ে নিতে হবে। এই বার হাত দিয়ে দুই মিনিট থেকে তিন মিনিট মুখের ত্বকে ম্যাসাজ করতে হবে। এতে করে ত্বকের গভীর থেকে যাবতীয় ময়লা, তেল আর জীবানূ পরিস্কার হয়ে যাবে। এর পরে ঠান্দা পানি দিয়ে খুব ভাল করে ত্বক পরিস্কার করে নিতে হবে।

এই ফেস প্যাক ব্যবহার করার সময় যা যা মনে রাখতে হবে

যে কোন ফেস প্যাক ব্যবহার করার কিছু নিয়ম কানুন থাকে। আর থাকে কিছু সতর্কতা। ফেস প্যাক বানাবার জন্য ব্যবহৃত উপকরণ এর তারতম্যের উপর এই সব নিয়ম কানুনের তারতম্য নির্ভর করে থাকে। তৈলাক্ত ত্বক এর জন্য তৈরী বেসনের এই ফেস প্যাক ব্যবহার করার সময়ও তেমনি কিছু সতর্কতা আমাদের মেনে চলতে হবে। তা না হলে এই ফেস প্যাক ব্যবহার করে লাভ থেকে বরং ক্ষতিই বেশি হয়ে যেতে পারে। সেই সতর্কতা গুলি এক এক করে বিস্তারিত বলে দিচ্ছি।

১ম সতর্কতা

এই ফেস প্যাক বানাবার জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে লেবু ব্যবহার করার হয়ে থাকে। আর বেশ ভাল পরিমাণেই এই ফেস প্যাকের জন্য লেবু ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাই এই ফেস প্যাক ব্যবহার করার সময় কোন ভাবেই রোদ কিংবা তাপের সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না। আসলে লেবুর মধ্যে থাকে প্রাকৃতিক ব্লিচিং এজেন্ট। এটা সত্য যে ব্লিচিং এজেন্ট আমাদের ত্বককে ধীরে ধীরে ফর্সা করে তোলে। কিন্তু ব্লিচিং এজেন্ট ত্বকে ব্যবহার করার পর রোদে বের হলে তা রোদে পুরে গিয়ে আমাদের ত্বককেও পুড়িয়ে দেয়। ফলে এক নিমিষেই আমাদের ত্বক কয়েক গুণ কালো হয়ে যায়। একই কথা খাটে চুলার তাপের ক্ষেত্রেও। তাই এই ফেস প্যাক ব্যবহার করার সময় এবং এটি ব্যবহার করার দুই ঘন্টা থেকে তিন ঘন্টার মধ্যে রোদে বের হওয়া যাবে না। এবং এই সময়ে রান্না ঘরের চুলার তাপের সংস্পর্শেও আসা যাবে না।

২য় সতর্কতা

যে কোন প্রকৃতিক উপায়ে ত্বক সুস্থ করার জন্য দরকার একটু সময় এবং ধৈর্য। আজ একটা ফেস প্যাক লাগালাম আর কালকেই এক দিনের মধ্যে আমার ত্বক কাঙ্খিত ফল পেয়ে গেল তা কিন্তু কোন হোম রেমেদির ক্ষেত্রেই খাটে না। যে কোন হোম রেমেডির ক্ষেতেরেই সঠিক ফল পাবার জন্য নিয়ম করে তা ব্যবহার করতে হয়। সঠিক ভাবে ব্যবহার করার পাঁচ থেকে সাত দিন এর মধ্যে আস্তে আস্তে ত্বক এই ফেস প্যাকের প্রভাব লক্ষ করা যায়। এই একই কথা খাটে আমার আজকের বেসন দিয়ে তৈরী এই ফেস প্যাকের ক্ষেত্রেও। এই ফেস প্যাক থেকে কাঙ্খিত ফল পাবার জন্য সপ্তাহে অন্তত তিন দিন এটি ব্যবহার করতে হবে। এবং সব থেকে ভাল হয় যদি রাতে ঘুমাতে যবার আগে এই ফেস প্যাকটি মুখে ব্যবহার করা যায়। তাহলে এই ফেস প্যাক এর ফল আরো দ্রুত আপনি আপনার ত্বকে লক্ষ্য করতে পারবেন।

এই ফেস প্যাক ব্যবহার করার উপকারিতা

এই ফেস প্যাক বানাবার জন্য যেই উপকরণ গুলি ব্যবহার করা হয়েছে সব গুলোই আমাদের ত্বক এর জন্য আশির্বাদ স্বরুপ। বিশেষ করে এই সব গুলো উপকরণই তৈলাক্ত ত্বক এর জন্য অনেক অনেক উপকার বয়ে আনে। ত্বক এর অতিরিকক্ত তেল এর জন্য যে সকল সমস্যা আমাদের হতে পারে সেই সব গুলো সমস্যাই এই ফেস প্যাক এর উপকরণ গুলি দারা সমাধাণ করে নেয়া সম্ভব। আসুন এক এক করে এই উপকরণ গুলির উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

বেসন এর উপকারিতা

এই ফেস প্যাক বানাবার অন্যতম প্রধাণ উপকরণ হচ্ছে বেসন। এই বেসন কিন্ত তোইলাক্ত ত্বক এর জন্য অনেক বেশি জরুরি একটি প্রাকৃতিক উপকরণ। কারণ বেসন খুব দ্রুত এবং খুব ভাল ভাবে ত্বক থেকে তেল শষণ করে নিতে পারে। বেসনের মত এত ভাল ভাবে কোন কেমিকেল যুক্ত ক্রীমও আপনার ত্বক থেকে বাড়তি তেল শোষণ করে নিতে পারবে না। এই কারণে ত্বকে যখন নিয়ম করে একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর ফেস প্যাক হিসেবে বেসন ব্যবহার করা হয়, তখন ত্বকে খুব সহজে বাড়তি তেল জমতে পারে না। আর এই একটি গুণ ছাড়াও আরো একটি কারনে আমাদের ত্বকের যত্নে নিয়ম করে বেসন ব্যবহার করা উচিত। সেটি হচ্ছে বেসন খুব ভাল একটি প্রাকৃতিক ক্লিনজার। এটি ত্বক এর অনেক গভীর থেকে তেলের সাথে সাথে যাবতীয় ময়লাও বের করে আনে। এবং ত্বক রাখে ফ্রেশ ও পরিস্কার। সেই সাথে এটি ত্বককে ফর্সাও করে তোলে।

মুলতানি মাটির উপকারিতা

মুলতানি মাটিও বেসনের মতই আমাদের ত্বক থেকে অতিরিক্ত তেল ও ময়লা দূর করতে সাহায্য করে থাকে। তবে সেই সাথে এটি আমাদের ত্বকে ব্রণ ও একনের কোন দাগ থাকলা তা দূর করতেও সাহায্য করে।

টক দই এর উপকারিতা

টক দই এ আছে ল্যাকটিক এসিড। এই ল্যাকটিক এসিড ত্বক এর রঙ হালকা করতে সাহায্য করে। তাছাড়া টক দই প্রাকৃতিক ক্লিনজারের মতও কাজ করতে পারে। তাছাড়া ত্বকে খুব সামান্য পরিমাণে আর্দ্রতাও যোগান দেয় টক দই যেটা যে কোন ধরণের ত্বকের জন্য খুবই জরুরি।

লেবুর রস এর উপকারিতা

লেবুর রস হচ্ছে প্রাকৃতিক ব্লিচ। এটি যে কোন কেমিকেল ব্লিচের মতই ত্বকের উপরের লেয়ারের রঙ আস্তে আস্তে হালকা করতে শুরু করে। ফলে ত্বক ধীরে ধীরে ফর্সা হয়ে ওঠে। আর তাহাড়া লেবুর রসের মধ্যে থাকে এন্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান। তাই নিয়ম করে ত্বক ফেস প্যাক এর মাধ্যমে লেবুর রস ব্যবহার করা হলে ত্বকে খুব সহজে ব্রণ কিংবা একনের সমস্যা দেখা দেয় না। আর আগে থেকে ব্রণ কিংবা একনের সমস্যা থাকলেও তা ধীরে ধীরে দূর হয়ে যেতে থাকে।

মন্তব্যসমূহ

আমি সাদিয়া রিফাত ইসলাম। একজন মা , হোমমেকার এবং ব্লগার। ভালভাসি রান্না করতে, বই পড়তে এবং লেখালেখি করতে।

মন্তব্য করুন